সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ
বীরভূমের দুবরাজপুর থানায় এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার রাতে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। মৃত যুবকের নাম বরজাহান শাহ (৩৫)। পুলিশের মারধরের জেরেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে পরিবার। যদিও পুলিশের দাবি, ওই যুবক চোর সন্দেহে গ্রামবাসীদের গণপিটুনির শিকার হয়েছিলেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে মৃতদেহ থানার সামনে রেখে বিক্ষোভ দেখান পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনেরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দুবরাজপুর থানার যশপুর পঞ্চায়েতের পছিয়াড়া গ্রামের একটি বাড়িতে ঢোকার অভিযোগ ওঠে বরজাহানের বিরুদ্ধে। কী কারণে তিনি ওই বাড়িতে ঢুকেছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশের দাবি, তাঁকে চোর সন্দেহে আটক করে গ্রামবাসীরা মারধর করেন। খবর পেয়ে দুবরাজপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে তাঁকে থানায় আনা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বরজাহানকে থানা থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাঁকে দুবরাজপুরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন বলে পরিবারের দাবি। অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের হাতে তাঁকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশের তরফে গণপিটুনির বিষয়টি সামনে আনা হলেও পরিবারের অভিযোগ, থানায় নিয়ে যাওয়ার পরেও তাঁর উপর নির্যাতন চালানো হয়।
মৃতের স্ত্রী তাজমিনা বেগমের অভিযোগ, স্বামীকে চোর সন্দেহে স্থানীয় বাসিন্দারা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ তাঁকে মারধর করে বলে তাঁর দাবি। এমনকী, মারধরের কারণে মুখ দিয়ে রক্ত বের হলেও পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, ঘটনার প্রকৃত কারণ আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মৃতের ছেলে ইসমাইল শাহও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তার দাবি, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সে তার বাবাকে পুলিশ মারধর করতে দেখেছে। শুধু সে নয়, গ্রামের আরও অনেকেই সেই দৃশ্য দেখেছেন বলে তার দাবি। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সামনে আনতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বোলপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অভিষেক রায় জানান, ওই ব্যক্তি যশপুর গ্রামের একটি বাড়িতে ঢুকেছিলেন। কী কারণে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, তা তদন্তসাপেক্ষ। তাঁকে চোর সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি। তাঁর বিরুদ্ধে আগে নেশা করা এবং ছোটখাটো অপরাধের অভিযোগ ছিল বলেও জানান তিনি। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওই পুলিশ আধিকারিক।
বরজাহানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বৃহস্পতিবার রাত থেকে দুবরাজপুর থানা চত্বরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনেরা মৃতদেহ নিয়ে থানার সামনে পৌঁছে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বিক্ষোভের জেরে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ১৪ নম্বর জাতীয় সড়কও।
পরিস্থিতি সামাল দিতে থানায় পৌঁছন পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চলার পর প্রায় চার ঘণ্টা বাদে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যশপুর পঞ্চায়েতের কৃষ্ণনগর গ্রামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শুক্রবার দুবরাজপুর আদালতে তোলা হলে বিচারক তদন্তের স্বার্থে ১০ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বলে জানা যায়।

