ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও আত্মরক্ষার স্মারক: বীরভূমের আড়াইশো বছরের প্রাচীন ‘লাঠির মেলা’

শম্ভুনাথ সেনঃ

শারদোৎসবের আনন্দঝরা দিনশেষে দেবীপক্ষের বিদায়লগ্নে যখন বিষাদের সুর, ঠিক তখনই বীরভূমের দুবরাজপুর ব্লকের প্রত্যন্ত কৃষ্ণনগর গ্রামে জেগে ওঠে এক ব্যতিক্রমী ও বর্ণিল উৎসব—‘লাঠির মেলা’। দুর্গাপূজার একাদশীতে প্রতিমা নিরঞ্জনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই মেলা বাংলার গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায়, যার ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো শিকড়ের সঙ্গে।
প্রতিবছর একাদশীর এই বিশেষ দিনে কৃষ্ণনগর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী পছিয়াড়া, যশপুর, লোহাগ্রাম, কান্তোর, সালুঞ্চিসহ প্রায় ১০-১২টি গ্রামের দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জনের উদ্দেশ্যে এই মেলাপ্রাঙ্গণে এসে জমায়েত হয়। সুসজ্জিত প্রতিমাগুলোর মেলাপ্রাঙ্গণ পরিক্রমা ও পুজোকে কেন্দ্র করে সমগ্র এলাকা এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এরপর একে একে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গ্রামের পুকুরে সম্পন্ন হয় প্রতিমা বিসর্জন।
স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরা প্রবাদ এবং ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, অন্তত আড়াইশো বছর আগে পরাধীন ভারতে বাংলায় যখন বর্গী হাঙ্গামার তান্ডব চলছিল, তখন সাধারণ মানুষের আত্মরক্ষার একমাত্র ভরসা ছিল লাঠি। সেই সময় আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাঠি তৈরির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলা হতো। বিশিষ্ট সাহিত্যিক হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘বীরভূম বিবরণ’ গ্রন্থেও কৃষ্ণনগরে বর্গী আক্রমণের বিশদ উল্লেখ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে বর্গী আমল ফুরোলেও, পূর্বপুরুষদের সেই আত্মরক্ষার প্রস্তুতি ও স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আজও একাদশীর এই দিনে মেলা প্রাঙ্গণে রমরমিয়ে চলে লাঠি কেনাবেচা।
এই মেলার সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় দিক হলো এর সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি। ধর্মমত নির্বিশেষে হিন্দু, মুসলমান সহ সর্বস্তরের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই মেলায় অংশ নেন। জাতপাত বা ধর্মের বিভেদ ভুলে এই মেলা হয়ে ওঠে গ্রামীণ সংস্কৃতির এক সুদৃঢ় মিলনক্ষেত্র।
মেলার মাঠে নানান পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নজর কাড়ে রং-বেরঙের ছোট-বড়, সরু-মোটা নানাবিধ বাঁশের লাঠি। কালের নিয়মে লাঠির ব্যবহার আজ কমে গেলেও, এই প্রাচীন মেলার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আজও বহু মানুষ সানন্দে বাঁশের লাঠি কিনে বাড়ি নিয়ে যান। আধুনিকতার প্রবল স্রোতে যখন বহু প্রাচীন লোকসংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির পথে, তখন বীরভূমের কৃষ্ণনগরের এই লাঠির মেলা আজও তার অতীত গৌরব, ঐতিহ্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা বুক আগলে সগর্বে বেঁচে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *