সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ
বিজেপির টিকিটে পঞ্চায়েত নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধান নির্বাচিত হওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার সেই প্রধানের বিরুদ্ধেই অনাস্থা প্রস্তাব আনলেন বিজেপির সদস্যরা। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বীরভূমের খয়রাসোল ব্লকের লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গিয়েছে, ১৪ আসন বিশিষ্ট লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে নির্বাচনের সময় বিজেপি ৮টি আসনে জয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং বোর্ড গঠন করে। তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল ৪টি আসন এবং তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ২ জন নির্দল সদস্য। খয়রাসোল ব্লকের মোট ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে সেই সময় একমাত্র লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতেই বিজেপি বোর্ড গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল।
বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে রূপা গোপ প্রধান নির্বাচিত হন। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রধান রূপা গোপ এবং বিজেপির আরও এক সদস্য দলবদল করে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করলে লোকপুর পঞ্চায়েতের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। প্রধানের দলবদলের পর কার্যত পঞ্চায়েতের ক্ষমতার সমীকরণ তৃণমূলের অনুকূলে চলে যায়। যদিও উপপ্রধান বিজেপিতেই থেকে যান।
রাজ্যে পালাবদলের পর ফের লোকপুর পঞ্চায়েতকে নিজেদের দখলে নেওয়ার লক্ষ্যে বিজেপি সক্রিয় হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। সেই প্রেক্ষিতেই প্রধান রূপা গোপের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। বিজেপির ছয়জন সদস্য গত ২১ আগস্ট খয়রাসোলের ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের (বিডিও) কাছে অনাস্থা প্রস্তাবের আবেদনপত্র জমা দেন বলে জানা গিয়েছে।
বিজেপির দুবরাজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের যুব মোর্চার সভাপতি নৃপেন্দ্রনাথ সাহা এক সাক্ষাৎকারে জানান, নিয়ম মেনে বিডিও অনাস্থা প্রস্তাবের বিষয়ে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর তলবি সভার ডাক দিয়েছেন।
অভিযোগ, প্রধান দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পঞ্চায়েত কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তাঁদের দাবি। সম্প্রতি ভিবিজিরামজি প্রকল্পের কাজের উদ্বোধনে প্রধানকে অনুপস্থিত দেখতে পাওয়া যায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে দুবরাজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক অনুপ কুমার সাহার বক্তব্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানের দায়িত্ব পাওয়ার পর সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দেওয়া তাঁর কর্তব্য এবং পঞ্চায়েতের কাজে তাঁকে উপস্থিত থাকতে হবে।
অন্যদিকে, লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান রূপা গোপ অনাস্থা প্রস্তাবের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ৩০ আগস্ট, রবিবার সকালে ব্লক প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঠানো অনাস্থা সংক্রান্ত চিঠি তিনি হাতে পেয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেননি বলেও তিনি জানিয়েছেন।
প্রধানের দাবি, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতির কারণে তিনি পঞ্চায়েতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন। একদিন পঞ্চায়েতে গিয়ে তাঁকে হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছিল বলেও তাঁর অভিযোগ। এ বিষয়ে স্থানীয় থানা এবং বিডিওর সাহায্য চাইলেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি বলে তিনি দাবি করেছেন।
সব মিলিয়ে বিজেপির টিকিটে জয়, প্রধান নির্বাচিত হওয়া, পরবর্তীকালে তৃণমূলে যোগদান এবং তারপর রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব—এই ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজনীতি এখন নতুন মোড় নিয়েছে।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের তলবি সভা ও অনাস্থা প্রস্তাবের পরবর্তী প্রক্রিয়ায় রূপা গোপ প্রধানের পদে বহাল থাকবেন, নাকি লোকপুর পঞ্চায়েতে ফের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে এলাকার রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষ।
