সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ
পাকা ধানের শিষ, মাটির সোঁদা গন্ধ আর কৃষকের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম—এই তিনের মেলবন্ধনে গ্রামবাংলার চিরাচরিত জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিকে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে তুলে ধরেছে বীরভূমের কাঁকরতলা থানার বাবুইজোড় গ্রামের শ্রীরামপুর হিন্দু মিলন মন্দির লক্ষ্মীপুজো ও ভাগবত কমিটি। পুজোর দশম বর্ষে তাদের এবারের ভাবনা ‘আয়াসের আনন্দ’। খড়, মাটি ও বাঁশের মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণে সাজিয়ে তোলা হয়েছে গোটা মণ্ডপ। অভিনব এই উদ্যোগ ইতিমধ্যেই দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে।
কৃষিপ্রধান এই গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, তাঁদের পরিশ্রম এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই তৈরি হয়েছে এবারের মণ্ডপ। মণ্ডপের আনাচে-কানাচে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গ্রামবাংলার চেনা ছবি। রয়েছে মাটির কুঁড়েঘর, তুলসীমঞ্চ, উঠোনের মাঙ্গলিক আলপনা এবং দেওয়ালজুড়ে আদিবাসী ও লোকশিল্পের নানা নকশা। পাশাপাশি লুপ্তপ্রায় গরুর গাড়ির চাকা, লাঙল ও ঐতিহ্যবাহী হ্যারিকেনের ব্যবহার মণ্ডপসজ্জায় এনে দিয়েছে বাড়তি আকর্ষণ। সব মিলিয়ে আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতিকে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে পুজো কমিটি।
কমিটি সূত্রে জানা গিয়েছে, দুবরাজপুরের শিল্পী গৌতম কর্মকারের মূল ভাবনায় স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় প্রায় ২০ দিনের পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে এই মণ্ডপ। মণ্ডপসজ্জার কাজে পুজো কমিটির সদস্যরাও সক্রিয়ভাবে হাত লাগিয়েছেন। অন্যদিকে, মণ্ডপের গ্রামীণ আবহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হেতমপুর থেকে আনা হয়েছে লক্ষ্মীপ্রতিমা।

পুজো কমিটির অন্যতম উদ্যোক্তা সৌমিক কর্মকার বলেন, কৃষক দিনরাত পরিশ্রম করে যে অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়েই পরিবারের মুখে হাসি ফোটে এবং উৎসবের আনন্দ আসে। কৃষকের সেই নিরলস পরিশ্রম, জীবনসংগ্রাম ও আনন্দকে সম্মান জানাতেই এবারের পুজোর এই বিশেষ ভাবনা। প্রায় এক লক্ষ টাকা বাজেটে আয়োজিত এই অভিনব মণ্ডপ ইতিমধ্যেই এলাকায় সাড়া ফেলেছে। পুজোর মণ্ডপ দেখতে সকাল থেকেই ভিড় জমাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

দশম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে পুজোর পাশাপাশি থাকছে একাধিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশুদের নাচ ও অঙ্কন প্রতিযোগিতা, ভক্তিমূলক ভাগবত পাঠের পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচের বিশেষ প্রদর্শনী। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে লোকসংস্কৃতির মেলবন্ধনে বাবুইজোড়ের এই লক্ষ্মীপুজো হয়ে উঠেছে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।
