নাট্যজগতের পরম অভিভাবক স্বপন রায় প্রয়াত: বীরভূম হারাল তার প্রিয় নাট্যপ্রাণকে

শম্ভুনাথ সেনঃ

বীরভূমের নাট্য আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক জগতের এক যুগের অবসান ঘটল। শুক্রবার কলকাতায় বোনের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বীরভূমের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব, ‘আনন’ নাট্যদলের অভিনেতা ও পরিচালক এবং বিশিষ্ট পত্রিকা ‘আননায়ুধ’-এর সম্পাদক স্বপন রায়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর প্রয়াণের খবরে সমগ্র বীরভূম তথা বাংলার নাট্য ও সাহিত্য জগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


স্বপন রায় কেবল একজন দক্ষ নাট্য অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে সফল পরিচালক, আবৃত্তিকার, সঞ্চালক এবং বিশিষ্ট আলোকচিত্রী (ফটোগ্রাফার)। সিউড়ির বিখ্যাত ‘রূপছায়া স্টুডিও’ ছিল জেলার কবি ,সাহিত্যিক, শিল্পী, কলাকুশলীদের আড্ডার মূল কেন্দ্র। নব্বইয়ের দশক, বিশেষ করে ১৯৯৪ সালের মাধ্যমিক ব্যাচ থেকে শুরু করে আশির দশকের সাহিত্যিক—সকলের কাছেই বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ছিলেন পরম বন্ধু ও স্নেহের ‘কাকু’। মিষ্টি ব্যবহার, গালভরা হাসি আর বুকভরা ভালোবাসায় তিনি সহজেই অন্যকে নিজের করে নিতে পারতেন।

কাউকেও ডাকতেন ‘বাবু’ বলে, তো কারও সন্তানের নাম রেখে দিতেন পরম স্নেহে এই অকৃতদার মানুষটি।
আশির দশক থেকেই ‘আননায়ুধ’ পত্রিকার সম্পাদনা ও ‘আনন’ নাট্যসংস্থার পরিচালনার মাধ্যমে তিনি বীরভূমে সংস্কৃতি চর্চার এক শক্তিশালী ধারা গড়ে তুলেছিলেন। সিউড়ির বেণীমাধব স্কুলের মোড়ে রূপছায়া স্টুডিওতে প্রতিদিন জমে উঠত শিল্প-সাহিত্য ও নাটকের আলোচনা। নাটকের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা এবং তরুণদের সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহিত করার মানসিকতা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।


দুর্গাপুজোর ঠিক আগেই চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতা যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। যাওয়ার আগের সন্ধ্যায়ও নিজের বাড়িতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন অনুগামীদের সঙ্গে। জীবনের ছোট মঞ্চ ছেড়ে তিনি চলে গেলেন আরও এক মহাজাগতিক মঞ্চের উদ্দেশ্যে।
স্বপন রায়ের এই আকস্মিক প্রয়াণে ‘ইয়ং নাট্য সংস্থা পরিবার’ সহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। নাট্যজগতের সহকর্মীরা জানান, এমন শিল্পীর প্রতি তাঁদের বুকভরা আলিঙ্গন, সুমধুর শব্দপ্রয়োগ। শিল্পী স্বপন রায় বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।


বীরভূম আজ সত্যিই তার এক প্রিয় অভিভাবককে হারাল। তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনায় সদর সিউড়ির সিধু কানু মঞ্চে তার মর দেহের পাশে হাজির হন জেলার স্বপন গুণমুব্ধ ও সংস্কৃতি জগতের অগণিত মানুষজন। সেখান থেকে তাঁর আত্মীয় পরিবার-পরিজন ও গুণমুদ্ধরা শোভাযাত্রা করে মরদেহ তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান।পরিবার সূত্রে খবর আজই ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বীরভূমের অন্যতম সতীপীঠ বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *