
শম্ভুনাথ সেনঃ
আজ ২ রা সেপ্টেম্বর কৌশিকী অমাবস্যা। বীরভূমের শক্তিপীঠ, তন্ত্রক্ষেত্র তারাপীঠে “মাতারার” মন্দির আজ সেজে উঠেছে অন্য সাজে। বীরভূমের রামপুরহাট ২ নম্বর ব্লকে দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত এই তারামায়ের মন্দির। জনশ্রুতি প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে বণিক জয়দত্ত সদাগর এক স্বপ্নাদেশ বলে মাতারার মন্দির নির্মাণ করেন। কালের স্রোতে তা বিলীন হলেও পরবর্তীতে বীরভূমের ময়ূরেশ্বর ২ নম্বর ব্লকের “ঢেকা’র” রাজা রামজীবন রায়চৌধুরী ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় মন্দির নির্মাণ করেন। ক্রমে তাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বর্তমান এই মন্দিরটি ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে মল্লারপুরের দানবীর জগন্নাথ রায়ের দেওয়া অর্থে নির্মিত হয়েছে। পঞ্চপীঠের বীরভূমে “তারাপীঠ” সিদ্ধপীঠ রূপে চিহ্নিত। তাই ধর্ম পিপাসু তামাম ভারতবাসী আজও বছরভর ছুটে আসেন এই সাধন ক্ষেত্রে। কথিত সর্বপ্রথম মহামুনি বশিষ্ঠদেব এখানে তারামায়ের সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। শেষ সাধক বাকসিদ্ধ পুরুষ সাধক বামাক্ষ্যাপা।
আজ এই বিশেষ তিথিতে তারামায়ের পুজো দিতে জড়ো হয়েছেন অগণিত ভক্ত-পুণ্যার্থী! বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী ও যাত্রী ভিড় সামাল দিতে পূর্ব রেল আজ থেকে তিন দিন “হাওড়া-রামপুরহাট” বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।এই তারাপীঠের সঙ্গে বামাক্ষ্যাপার নাম জগৎখ্যাত। আজ থেকে ১৮৫ বছর পূর্বে বাংলা ১২৪৪ সনে ফাল্গুনের এক পবিত্র শিব চতুর্দশী তিথিতে জন্মেছিলেন বীরভূমের বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়।পরে তিনিই হয়ে যান সাধক বামাক্ষ্যাপা। তারাপীঠের পশ্চিমে মাত্র তিন কিমি দূরে খরুন গ্রাম পঞ্চায়েতের “আটলা” গ্রামে বামাক্ষ্যাপার জন্মভূমি। পিতা সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে শিশুকালেই “তারামায়ে’র” মন্দিরে প্রবেশ। এই বাল্যকাল থেকেই তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা ছিল একমাত্র “তারামা”। ‘মা’ ‘মা’ ধ্বনিই ছিল তাঁর সাধনার মূল মন্ত্র! উল্লেখ্য, ১২৭৪ বঙ্গাব্দের এমন এক কৌশিকী অমাবস্যায় সাধক বামাক্ষ্যাপা মাত্র ৩০ বছর বয়সে তারামায়ের সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। এই উপলক্ষে আজ ২ রা সেপ্টেম্বর মন্দির চত্বরে মহাযজ্ঞ ও নিশিপূজার আয়োজন করা হয়েছে। তারাপীঠ মহাশ্মশানে সামিল হাজারো সাধু-সন্ত থেকে তন্ত্রসাধকরা।
আজ ভোর ৫:০৭ মিনিটে শুরু হয়েছে অমাবস্যা। তার আগে মা তারার ব্রহ্ম শিলামুর্তিকে স্নান করানো হয়। পরে ফুল ও স্বর্নালঙ্কার সাজানো হয় রাজ রাজেশ্বরী বেশে। তারপর শুরু হয় মঙ্গলারতি। মঙ্গলারতির পর পুণ্যার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজা। তারপর থেকেই মা তারাকে পুজো দিচ্ছেন পূর্ন্যার্থীরা। আজ দুপুরে অন্নভোগ নিবেদন করার আগে ফের মা তারাকে রাজবেশে সাজানো হবে। গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ করে সবার অন্তরালে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। এই সময় মন্দিরের দুটি দরজা বন্ধ রাখা হয়। আজকের ভোগে রাখা হয় পোলাও, ফ্রায়েড রাইস, ভাত, ডাল,পাঁচ রকমের ভাজা,পাঁচ রকমের তরকারি, মাছ,বলির পাঁঠার মাংস, শোলমাছ পোড়া, পাঁচ রকমের মিষ্টি,পায়েস ও কারন। সন্ধ্যায় মা তারাকে শোলার ডাকের সাজে সাজানো হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় শুরু হবে মঙ্গল আরতি। মঙ্গল আরতির পর মা তারাকে খই, মুড়কি, বাতাসা, লুচি ও মিষ্টি দিয়ে শীতল ভোগ নিবেদন করা হবে। আজ সারা রাত্রি মন্দির খোলা থাকবে। পুণ্যার্থীরা সারারাত মা তারাকে পুজো দিতে পারবেন।
অমাবস্যা তিথি শুরু হতেই মন্দিরের পাশে থাকা তারাপীঠ মহাশ্মশানে শুরু হয়ে গিয়েছে হোমযজ্ঞ ও তন্ত্র সাধনা। সন্ধ্যার পর সেই হোমযজ্ঞের সংখ্যা আরো বাড়বে। এই কৌশিকী অমাবস্যার তিথিতে তারাপীঠ মহাশ্মশানে তন্ত্র সাধনা করতে এসেছেন বহু তন্ত্রসাধক। তারাপীঠের মূল মন্দির সাজানো হয়েছে ফুল ও রংবেরঙের আলোক মালায়। বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। প্রবেশ পথগুলিতে বসানো হয়েছে মেটাল ডিটেক্টর গেট। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে ১,০০০ পুলিশ কর্মী, ১,৭০০ জন সিভিক ভল্যান্টিয়ার ও মন্দির কমিটির ৩০০ জন বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী।