
উত্তম মণ্ডলঃ
বাল্মিকী-ব্যাসদেবের পরেই কাব্যজগতে যাঁর স্থান, এক নি:শ্বাসে বলা যায় তাঁর নাম—কালিদাস, মহাকবি কালিদাস। কিন্তু কালিদাস কাব্যজগতে যতখানি উজ্জ্বল, তাঁর জীবন কাহিনী ততটাই অন্ধকারে। প্রথমেই ধরা যাক, কালিদাস ও তাঁর স্ত্রী কমলা দেবীকে নিয়েই প্রচলিত বোকামির গল্পটা। গল্পের নায়ক কালিদাস, নায়িকা সে দেশের রাজকন্যা, কমলা নামে যিনি পরিচিতা আর খল নায়কের ভূমিকায় দেশের পণ্ডিতরা।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি কালিদাস ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে আজও এক বিস্ময়কর প্রতিভার নাম। গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের “নবরত্ন” সভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রত্ন তিনি। তাঁকে গল্পও রয়েছে। আমরা সে সব জানি। এখানে শুধু সেই গল্পকে ছু়ঁয়ে যাওয়া হচ্ছে মাত্র।…
প্রথম জীবনে বোকা ছিলেন কালিদাস। থাকতেন প্রাচী দেশের উজ্জ্বয়িনী রাজ্যের শিপ্রা নদীর তীরে। এদিকে উজ্জ্বয়িনীর রাজকন্যার কাছে তর্কে হেরে তাঁকে জব্দ করার ফন্দি আঁটলেন হেরো পণ্ডিতদের দল। তাঁরা চাইলেন, এক নিরেট বোকা লোকের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে দিতে হবে। এতএব বোকা লোকের খোঁজে পথে নামলেন তাঁরা, যাকে বলে “ফিল্ড ওয়ার্ক”, আজকের গবেষণার ভাষায় “ক্ষেত্র সমীক্ষা।”
পথে যেতে যেতে এক জায়গায় দেখলেন, একজন লোক একটি গাছের ডালের ডগায় বসে তার গোঁড়ার দিকটা কুড়ুল দিয়ে কাটছে। কিন্তু কাটার পর ডালটা যে তাকে নিয়েই মাটিতে ধপাস করে পড়বে, সেটা বোঝার মতো জ্ঞান তার নেই।
একেবারে “মিল গয়া, মিল গয়া ” বা ” ইউরেকা ইউরেকা” উচ্ছ্বাস পণ্ডিতদের মধ্যে।
এরপর তো ভুলিয়ে ভালিয়ে রাজকন্যার সঙ্গে বিয়েও দিয়ে দিল পণ্ডিতদের দল। চরম প্রতিশোধ!
তারপর শোবার ঘরে মশারির দরজা (?) খুঁজে না পেয়ে দে ঝাঁপ রাজকন্যার গায়েই। এবার রাজকন্যা বুঝে গেলেন, দেশের পণ্ডিতরা তাঁর সঙ্গে এক নির্ভেজাল বোকার বিয়ে দিয়েছে! বাইরে উট ডাকলে সে আবার বলে কিনা “উষ্ট্র!”
এরপর অর্ধচন্দ্র দিয়ে কালিদাস বিদেয়। মনের জ্বালায় শুরু হলো কালিদাসের অনিশ্চিত পথ চলা। চলতে চলতে একটি সরোবরের ধারে এসে বিশ্রাম। ঠিক করলেন, এখানকার জলে ডুবেই প্রাণ বিসর্জন দেবেন। কিন্তু তার আগেই অবাক হয়ে কালিদাস দেখলেন, সরোবরের ঘাটের পাথরের ওপর গর্ত। মেয়েরা জল নিতে এসে ওই পাথরের ওপরেই কলসি রাখে আর তাতেই ক্ষয়ে গেছে কঠিন পাথর। দেখে কালিদাস ভাবলেন, শক্ত পাথর যদি ক্ষয় হতে পারে, তবে তার বুদ্ধি হবে না কেন! ওখানেই শুরু হলো কালিদাসের সরস্বতী তপস্যা।
তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী সরস্বতী কালিদাসকে দেখা দিয়ে শ্রেষ্ঠ কবি হবার বর দিলেন। বর পেয়েই সরস্বতীর বরপুত্র মুখে মুখেই রচনা করে ফেললেন সরস্বতী বন্দনা। আজও সরস্বতী পুজোর দিন সরস্বতী বন্দনায় মাতেন বিদ্যার্থীকুল।
এ তো গেল আখ্যান ভাগ। এবার আমরা রক্ত-মাংসের কালিদাসকে খুঁজবো।…
কেউ বলেন, তাঁর সাধনস্থল বীরভূম জেলার নানুরের "সরস্বতী তলা।"
কেউ বলেন, তাঁর সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় মেদিনীপুরের কাঁথি এলাকার সমুদ্র উপকূলের ভূগোল। তাই তিনি মেদিনীপুরের কাঁথির লোক। যদি তিনি কোনো পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা বা মরুভূমি অঞ্চলের বাসিন্দা হতেন, তবে তাঁর বর্ণনায় তার ছাপ থাকতো। কাঁথি উপকূলে সমুদ্র রয়েছে দক্ষিণে। তাই সমুদ্রের হাওয়া পেতে মানুষের দক্ষিণ-দুয়ারি বাড়ি তৈরির একটি প্রচলিত রীতি।
আরেকটি মতবাদ প্রচলিত আছে, বীরভূম জেলার নানুরের কাছে বেলুটি গ্রামে মহাকবি কালিদাসের আবির্ভাব ও সরস্বতী সাধনায় সিদ্ধিলাভ ঘটে। এখানে আজও রয়েছে কালিদাসের স্মৃতিবিজড়িত “সরস্বতী তলা।” প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, এই নানুরের মাটিতেই আবির্ভূত হয়েছিলেন আরেক মরমী সাধক কবি রামী-চণ্ডীদাস।
বীরভূম জেলার নানুর ব্লকের গ্রাম এই বেলুটি। একসময় এখানে বেলগাছের প্রাচুর্য থাকার কারণেই এই নাম বলে গবেষকদের মত। এই বেলুটি গ্রাম থেকে গুপ্তযুগের মুদ্রা ও বিভিন্ন প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এখানে গুপ্তযুগের একটি কুণ্ড থেকে উদ্ধার হয় দেবী সরস্বতীর পাথরের মূর্তি। পরবর্তী সময়ে কালাপাহাড়ের হাতে সে মূর্তি ধ্বংস হয়। মূর্তিটিকে টুকরো টুকরো করে ফেলে দেওয়া হয় কালিদাসের সাধনস্থল বলে কথিত সরোবরের জলে। বেলুটি গ্রামের বর্তমান সরস্বতী মন্দিরের কাছে যে কয়েকটি পুকুর রয়েছে, সেগুলি মিলে একসময় একটি বিশাল সরোবর ছিল, যার পাড়ে বসেই সরস্বতী-সিদ্ধ হোন কালিদাস। পুকুর থেকে কালাপাহাড়ের হাতে বিধ্বস্ত সরস্বতী মূর্তির ছয়টি খণ্ড উদ্ধার হয় এবং সেগুলির রোজ পুজো করা হয়।
বেলুটি গ্রামের বর্তমান মহাকবি কালিদাস উচ্চ বিদ্যালয়ের স্থানেই ছিল “দেউলের ঢিবি” নামে একটি ধ্বংসস্তূপ। সেখানেই ছিল প্রাচীন সরস্বতী মন্দির ও বিগ্রহ।
জানা যায়, পুকুর থেকে উদ্ধার হওয়া সরস্বতী মূর্তির খণ্ডিত অংশগুলি দীর্ঘদিন গ্রামের তমালবনের নিমতলায় পুজো করা হতো। পরবর্তী সময়ে সরস্বতী মন্দির তৈরি করে দেন গ্রামের চিত্রবালা দেবী। কিন্তু সে মন্দির কালের নিয়মে ভেঙে গেলে বর্তমান মন্দিরটি তৈরি করে দেন দিল্লিবাসী সুবীর পাণ্ডা।
কয়েক বছর আগে বেলুটি গ্রামের একটি পুকুর সংস্কারের সময় সেখান থেকে উদ্ধার হয় একটি পাথরের মূর্তি। মূর্তিটির পিছনে দেবনাগরী লিপিতে “শ্রীমাধব” কথাটি লেখা আছে বলে জানা যায়। মূর্তিটি গুপ্তযুগের বলে গবেষকদের অভিমত। স্থানীয় একটি মন্দিরে ওই মূর্তিটিও পূজিত হচ্ছেন। এছাড়া বাংলায় একটি বহুল পদবি হচ্ছে “দাস” এবং সেই সূত্রে কালিদাসের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয় বলেও গবেষকদের অভিমত।
তবে প্রামাণ্য নথি না থাকলেও মানুষের বিশ্বাসে রয়েছে, এই বেলুটি গ্রামেই মহাকবি কালিদাসের আবির্ভাব ও সরস্বতী সাধনার কথা। নিত্যপুজো ছাড়া সরস্বতী পুজোর সময় বেলুটি গ্রামে সরস্বতীর মূর্তি পুজো হয় না। প্রাচীন সরস্বতী মূর্তিকে মান্যতা দিতেই গ্রামবাসীদের এই সিদ্ধান্ত বলে জানা যায়। সরস্বতী পুজোর দিন বহু দূর-দূরান্তের মানুষ এই বেলুটি গ্রামে আসেন। তাঁদের বিশ্বাসে মহাকবি কালিদাস ও দেবী সরস্বতীর প্রতি অগাধ ভক্তি-বিশ্বাস। কালিদাসের নামে বেলুটি গ্রামে গড়ে উঠেছে ” বেলুটি মহাকবি কালিদাস স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়” ও ” বেলুটি কালিদাস মেমোরিয়াল ক্লাব।”
বীরভূম জেলার রাজনগর ব্লকের চন্দ্রপুর থানার তাঁতিপাড়া গ্রামের চণ্ডীনগর পাড়ায় রয়েছে প্রায় দুশো বছরের প্রতিষ্ঠিত সরস্বতী মন্দির। এলাকাটি একসময় ঝোপ-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। এখনো তার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি পুরোনো বটগাছ। এক অনামী সন্ন্যাসী এখানে সরস্বতী পুজোর প্রচলন করেন। প্রতি বছর দেবী সরস্বতীর পুজো হয়। তবে এর সঙ্গে কালিদাসের কোনো কাহিনী প্রচলিত নেই।
কালিদাস সরস্বতী সিদ্ধ হয়েছিলেন। সেজন্য বসন্ত পঞ্চমীতে অনুষ্ঠিত সরস্বতী পুজোর দিন আয়োজিত হয় শিশুদের বিদ্যারম্ভ “হাতে খড়ি” অনুষ্ঠান। এটি “ভ্যালেন্টাইন ডে” কখনও হয়, এটি বাঙালির হাতে খড়ি উৎসবের দিন।
সিংহলে এক বারবণিতার ছুরিকাঘাতে মহাকবির মৃত্যু হয় বলে কথিত আছে।
