নয়াপ্রজন্ম প্রতিবেদনঃ
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিনয়–বাদল–দীনেশ নাম তিনটি আজও সমানভাবে উচ্চারিত হয়। সেই ত্রয়ীর অন্যতম বিপ্লবী শহীদ দীনেশ গুপ্ত ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে একাধিক চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিগুলি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং এক যুগের আদর্শ, আত্মত্যাগ ও মানবিকতার অমূল্য দলিল।
১৯৩১ সালের জুন মাসে লেখা এই চিঠিগুলিতে দীনেশ গুপ্তের মানসিক দৃঢ়তা, মানবধর্মে বিশ্বাস এবং আত্মোৎসর্গের প্রস্তুতির ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরও তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে এক অদম্য আত্মবিশ্বাস ও গভীর মানবিক বোধ।
মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ এবং কয়েক দিন আগে লেখা এই চিঠিগুলিতে সামাজিক সমালোচনা থেকে জীবনের চরম দর্শনের এক অনন্য বিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
ধর্মের চেয়ে বিবেকের আহ্বান বড়
১৮ জুন তারিখে তাঁর বৌদিকে লেখা একটি চিঠিতে দীনেশ দেশের সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন:
- ধর্মের ভণ্ডামি: তিনি লিখেছেন, যে দেশে মানুষকে স্পর্শ করলে মানুষের ধর্ম নষ্ট হয়, সেই ধর্ম আজই গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া উচিত।
- সর্বোচ্চ ধর্ম: তাঁর মতে, মানুষের বিবেকই হলো সবার চেয়ে বড় ধর্ম। তিনি আক্ষেপ করেছেন যে, মানুষ তুচ্ছ কারণে বা ধর্মের নামে একে অপরের সাথে খুনোখুনি করছে।
- ঈশ্বর ও বিচার: তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যারা ধর্মের নামে অধর্ম করে, ভগবান বা খোদা কি তাঁদের জন্য স্বর্গের দ্বার খোলা রাখবেন?
মৃত্যু যখন পরম মিত্র
ফাঁসির মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ৩০ জুন তারিখে তাঁর মাকে (যাকে তিনি ‘নশু’ নামে চিঠি লিখেছেন) সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তাঁর সুর হয়ে ওঠে দার্শনিক ও নির্ভীক:
- ঈশ্বরের বিচার: তিনি তাঁর মাকে অনুরোধ করেছেন যেন তিনি ভগবানকে ‘পাষাণ’ মনে না করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ভগবানের সৃষ্টিতে কখনও অবিচার হতে পারে না।
- নির্ভীকতা: দীনেশ মৃত্যুকে তুলনা করেছেন ছোট বাচ্চার ‘জুজুবুড়ির ভয়ের’ সাথে। তাঁর মতে, যে মরণকে একদিন সবাই বরণ করবে, তা দুদিন আগে আসাতে ক্ষোভের কিছু নেই।
- শেষ অভিবাদন: অসাধারণ সাহসিকতার সাথে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, মৃত্যু তাঁর কাছে কোনো শত্রু নয়, বরং ‘মিত্র’ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অল্প বয়সেই মহাপ্রয়াণ
১৯১১ সালের ৬ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা দীনেশ গুপ্তের বয়স ফাঁসির সময় ছিল মাত্র ১৯ বছর। এত অল্প বয়সেই তাঁর লেখনীতে যে পরিপক্কতা দেখা গেছে, তা সমকালীন বিশ্বকে বিস্মিত করে।
*চিঠি – ১
আলিপুর সেন্ট্রাল জেল ১৮ই জুন, ১৯৩১, কলিকাতা
বৌদি,
যে দেশে মানুষকে স্পর্শ করিলে মানুষের ধর্ম নষ্ট হয়, সে দেশের ধর্ম আজই গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়া নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত। সবার চাইতে বড় ধর্ম মানুষের বিবেক। সেই বিবেককে উপেক্ষা করিয়া আমরা ধর্মের নামে অধর্মের স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়াছি। একটা তুচ্ছ গরুর জন্য, না হয় একটু ঢাকের বাদ্য শুনিয়া আমরা ভাই ভাই খুনোখুনি করিয়া মরিতেছি। এতে কি ভগবান আমাদের জন্য বৈকুণ্ঠের দ্বার খুলিয়া রাখিবেন, না খোদা বেহেশতে আমাদিগকে স্থান দিবেন?
যে দেশকে ইহজন্মের মত ছাড়িয়া যাইতেছি, যাহার ধুলিকণাটুকু পর্যন্ত আমার কাছে পবিত্র, আজ বড় কষ্টে তাহার সম্বন্ধে এ’সব বলিতে হইল।
আমরা ভাল আছি; ভালোবাসা ও প্রণাম লইবে।
— স্নেহের ছোট ঠাকুর পো আলিপুর সেন্ট্রাল জেল।
*এই চিঠি লেখার উনিশ দিন পরে ফাঁসি হয় শহীদ দীনেশ গুপ্তের।
**চিঠি – ২
আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, কলিকাতা। ৩০শে জুন, ১৯৩১
মা,
যদিও ভাবিতেছি কাল ভোরে তুমি আসিবে, তবু তোমার কাছে না লিখিয়া পারিলাম না।
তুমি হয়তো ভাবিতেছ, ভগবানের কাছে এত প্রার্থনা করিলাম, তবু তিনি শুনিলেন না। তিনি নিশ্চয়ই পাষাণ, কাহারও বুক-ভাঙা আর্তনাদ তাঁহার কানে পৌঁছায় না।
ভগবান কি আমি জানি না, তাঁর স্বরূপ কল্পনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় কিন্তু তবু একথাটা বুঝি, তাঁর সৃষ্টিতে কখনও অবিচার হইতে পারে না। তাঁর বিচার চলিতেছে। তাঁর বিচারের উপর অবিশ্বাস করিও না, সন্তুষ্ট চিত্তে সে বিচার মাথা পাতিয়া নিতে চেষ্টা কর। কি দিয়া যে তিনি কি করিতে চান, তাহা আমরা বুঝিব কি করিয়া?
মৃত্যুটাকে আমরা এত বড় করিয়া দেখি বলিয়াই সে আমাদিগকে ভয় দেখাইতে পারে। এ যেন ছোট ছেলের মিথ্যা জুজুবুড়ীর ভয়। যে মরণকে একদিন সকলেরই বরণ করিয়া লইতে হইবে, সে আমাদের হিসাবের দুদিন আগে আসিল বলিয়াই কি আমাদের এত বিক্ষোভ, এত চাঞ্চল্য?
যে খবর না দিয়া আসিত, সে খবর দিয়া আসিল বলিয়াই কি আমরা তাকে পরম শত্রু মনে করিব? ভুল, ভুল,—মৃত্যু মিত্ররূপেই আমার কাছে দেখা দিয়াছে। আমার ভালবাসা ও প্রণাম জানিবে।
—তোমার নশু।
**এই চিঠি লেখার সাত দিন পরে ফাঁসি হয় শহীদ দীনেশ গুপ্তের।
