
উত্তম মণ্ডলঃ
পাঠান-মোগল শাসন অস্তমিত প্রায়। তারপর ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন “বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল রাজদণ্ডরূপে পোহালে শর্বরী।” পলাশীর পর দরজায় কড়া নাড়ছে ব্রিটিশ। এমনই এক সন্ধিক্ষণ। ঠিকানা: জেলা বীরভূমের বর্তমান দুবরাজপুর থানার অন্তর্গত শৈবক্ষেত্র বক্রেশ্বরের কিছুটা পশ্চিম দিকে গেলেই গ্রাম “বুড়েমা” এবং এই বুড়েমা পেরিয়েই আজকের আলোচিত গ্রাম “গৌরগঞ্জ।”
আঞ্চলিক ইতিহাসের খোঁজে হাজির হয়েছিলাম গৌরগঞ্জ গ্রামে। গ্রামের অনেক মানুষ এখন বক্রেশ্বর এবং তার কাছে হরিদাসপুর এলাকায় নতুন বাড়ি করে বসবাস করছেন। তবে চাষ জমি তো আর উঠিয়ে আনা যায় না। তাই চাষের জমিজমা রয়ে গেছে গৌরগঞ্জ গ্রামেই।
গৌরগঞ্জ গ্রাম গড়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে অপমান আর লাঞ্ছনা। মানুষের যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন আত্মরক্ষার উপায় বেছে নিতে হয়। এখানেও তাই হয়েছিল। আগে গৌরগঞ্জ গ্রামটি কাছাকাছি বুড়েমা গ্রামের পেটেই ছিল। কিন্তু পরে ভেঙে গড়ে ওঠে পাশেই গৌরগঞ্জ গ্রাম। সে কথাই শোনাবো এবার।
গ্রামের ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে ২০২১-এর ১৬ নভেম্বরের দুপুরে হাজির হই গ্রামের ৭৭ বছরের প্রবীণ অনিল মণ্ডলের বাড়িতে। তিনি বেশ কয়েক বছর আগেই গৌরগঞ্জ ছেড়ে বক্রেশ্বরের কাছে হরিদাসপুর গ্রামে বাড়ি করে বসবাস করছেন। খুঁজতে খুঁজতে হাজির হলাম সেখানেই। কয়েকদিন আগে নিম্ন চাপের অকাল বর্ষণে হালকা শীতের আমেজ। মাঠে পাকা ধান জলে প্রায় ভাসছে। চাষিদের সাড়ে সর্বনাশ!
যাই হোক, অনিলবাবু বাড়ির উঠোনে বসেছিলেন। পাশে নিত্যসঙ্গী লাঠি। মেট্রিক পাশ করে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি জীবন কাটিয়ে এখন শুধুই অখণ্ড অবসর জীবন। তবে স্মৃতিশক্তি প্রখর। ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি রিলে করে গেলেন একনাগাড়ে। মাঝে মাঝে আমার প্রশ্ন, অনিলবাবুর তরফে উত্তর আসে তার। উঠে আসে গ্রাম তৈরির ইতিহাস।
যাঁরা বলেন, জাতি বলে কিছু নেই, তাঁরা এই লেখা থেকে আশা করি, উত্তর পেয়ে যাবেন। তবে ভারতীয় সংবিধানে যখন জাতি সংরক্ষণ থাকে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় জাতি সংরক্ষণ থাকে, চাকরি, লেখাপড়ায় জাতি সংরক্ষণ থাকে, তখন এ দেশে জাতিভিত্তিক শ্রেণী বিন্যাসকে কি অস্বীকার করা যায়?
আর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে যাঁরা হিন্দুত্বের দাবি তুলে তামাম হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান, তাঁদের মাথাতেও জাতির বিষয়টি ঢোকানো দরকার তেতো ওষুধ গেলার মতো। বর্ণভেদ থেকে জাতিভেদ, দেবতা নিয়ে ঝগড়া, কে বড়ো কালী, না কৃষ্ণ, তা নিয়ে এক হিন্দুত্বের ছাতার তলায় যখন লড়াই চলে, তখনও কেউ কেউ প্রবচন দিয়ে যান, ঐক্য, ঐক্য, ঐক্য চাই। অথচ মূল জাতিভেদের অভিশপ্ত শেকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয় না। অথচ শ্রীচৈতন্য বহু চেষ্টা করে গেছেন, তাঁর অন্যতম পার্ষদ নিত্যানন্দ ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে পানিহাটির গঙ্গা তীরে একসঙ্গে ছত্রিশ জাতের লোককে এক পংক্তিতে বসিয়ে চিঁড়ে-দৈ খাইয়ে জাতিভেদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের এই সামাজিক ভূমিকা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তবে কীর্তন, ভজন ও ভোজন নিয়ে জোর চর্চা চলে আমাদের। ফলে জাতিভেদের অশরীরী প্রেতাত্মা আমাদের এগোতে দেয় না। চণ্ডীদাসের “সবার উপরে মানুষ সত্য” অধরাই থেকে যায়।
কথাগুলি বললাম, কারণ যে গৌরগঞ্জ গ্রাম তৈরির কথা বলতে যাচ্ছি, তার নেপথ্যে রয়েছে জাতি বিদ্বেষ।
শুরুটা এভাবেই করা যেতে পারে:
বুড়েমা গ্রামের রাজপুত ক্ষত্রিয়রা তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ, রাজার নিষ্কর ঘাটোয়ালী জমি পেয়ে অভিজাত আর তাই গ্রামের মাহিষ্য চাষিদের প্রতি ছিল না তাদের কোনো ভালোবাসা। সে সময় গ্রামের মাহিষ্য পরিবারের কেউ ভালো পোশাক পরতে পারতো না, জুতো পায়ে হাঁটা ছিল অপরাধ! সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হতো তাদের। আর এ ধরণের “অপরাধ” করলে ছিল শারীরিক শাস্তির ব্যবস্থা। অপমান থেকে মারধোর সবকিছুই চলতো। এভাবেই দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়।
এর মধ্যে একদিন গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়ার কথা মাথায় এলো গৌর মণ্ডলের। নি:সন্তান গৌর মণ্ডলের পিছুটান ছিল না। তাঁরা তিন ভাই—বড়ো গৌর, মেজ গোপাল এবং ছোট বিপিন। অনিলবাবু ছোট ভাই বিপিন মণ্ডলের উত্তর পুরুষ।
গৌর মণ্ডলের পরামর্শমতো গ্রামের সমস্ত মাহিষ্য চাষির দল গ্রাম ছেড়ে চলে গেল আরও কিছুটা পশ্চিমে ঘন জঙ্গলে। দিনরাত চললো জঙ্গল কেটে বসতবাড়ি তৈরি ও পাশাপাশি বেঁচে থাকার জন্য চাষ জমি তৈরির কাজ। সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে অবশেষে সত্যিই গড়ে উঠলো এক নতুন গ্রাম, গৌর মণ্ডলের নাম অনুসারে তার স্থায়ী নাম হয়ে গেল “গৌরগঞ্জ।” গ্রামের তিনটি নাম হলো—গৌরগঞ্জ, ধান্যখুনা ও নতুন বলে “নতুন গ্রাম।” তবে শেষ পর্যন্ত গৌর মণ্ডলের নামে “গৌরগঞ্জ” নামটিই সরকারি খাতায় স্বীকৃতি পায়।
রীতিমতো জাঁদরেল লোক ছিলেন গৌর মণ্ডল। দীর্ঘদিন রাজপুতদের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আজকের গৌরগঞ্জ গ্রাম। জঙ্গলে গাছের মুড়ো কেটে তৈরি বলে গৌরগঞ্জ গ্রামকে বলা হয় “মুড়ো কাটা বসতি।”
১২০ বিঘে জমির ওপর দাঁড়িয়ে গ্রাম “গৌরগঞ্জ।” গ্রাম তৈরির পর গ্রামের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেতে তৈরি হলো গ্রামের শেষ প্রান্তে গ্রাম দেবতার থান—“গ্রাম থান।” দেবতার কোনো নাম নেই, তবে একটি মহুয়া গাছের নিচে একটি কালো পাথরকেই গ্রাম দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করা হয়। আজও এই প্রাচীন মহুয়া গাছটি এলাকায় একদা জঙ্গলের উপস্থিতির সাক্ষ্য দেয়। গ্রামের কোনো বাড়িতে নববধূ এলে তাকে প্রথম এই গ্রাম থানে প্রণাম জানিয়ে তবে বাড়িতে ঢুকতে হয়।
গ্রাম ঢোকার মুখে রয়েছে দমদমা চাষ জমি। উচ্ছে-বেগুন-পটল-মুলো চাষের জমি, স্থানীয় ভাষায় যার নাম “তড়ি।” “দমদমা” বলতে বোঝায় উঁচু জমি। আরবি শব্দ “দমদমহ” থেকে এসেছে “দমদমা” শব্দটি, যেখানে কাজ করতে শরীরের “দম” অর্থাৎ জোর লাগে। আর যে জায়গা থেকে একনাগাড়ে “দম-দমাদম” আওয়াজ শোনা যায়, সেই জায়গাটিই “দমদমা।” সোজা কথায়, এটিকে সৈন্যদের বন্দুক নিশানা করার প্রশিক্ষণ স্থানকেও বোঝায়। এই উঁচু জমিতে একসময় দমাদম বন্দুক চালানো অভ্যাস করতো সৈন্যরা।
ক্ষেত্র সমীক্ষায় দেখা যায়, বুড়েমা গ্রামের কাঁদরের ধার থেকে শুরু করে গৌরগঞ্জ গ্রাম ঢোকার মুখেই বিস্তৃত এই “দমদমার মাঠ।” একটু দূরেই দক্ষিণ দিকে রয়েছে গ্রাম “ঘাট-গোপালপুর।” “ঘাট” মানে বনপথ (Gate way) অর্থাৎ বনের ভেতর দিয়ে যাবার পথ। এই পথে ছিল “ঘাট-ওয়াল” অর্থাৎ পাহারাদার, যা থেকে পরে হয় “ঘাটোয়াল।” ঘাট-গোপালপুর গ্রামের কাছে বীরভূমের প্রাচীন রাজধানী রাজনগর রাজার একটি “গড়” অর্থাৎ সেনানিবাস ছিল। এখনও তার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বাইরের শত্রুর আক্রমণ আটকাতে রাজধানী রাজনগরকে চারদিক দিয়ে মাটির উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে ক্যাপ্টেন শেরউইলের রিপোর্টে এই ভাঙা মাটির পাঁচিলের কথা আছে।
গৌরগঞ্জ গ্রামের পরের গ্রাম “প্রতাপপুর।” এই গ্রামের সিংহ পদবিধারী ক্ষত্রিয় রাজপুত বীর যোদ্ধারা পাহারা দিতেন ঘাট-গোপালপুর গ্রামের “ঘাট।” আর এই পাহারাদার প্রতাপশালী রাজপুতরা যে স্থানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন, তার নাম হয়ে যায় “প্রতাপপুর।” অতীতের বীরত্বের স্মৃতি নিয়ে এখনও প্রতাপপুর গ্রাম সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
গৌরগঞ্জ গ্রামে বর্তমানে “সিংহ” পদবিধারী একঘর রাজপুত ঘাটোয়াল পরিবার রয়েছেন। এভাবেই এখনও জেগে আছে গৌর মণ্ডল প্রতিষ্ঠিত গৌরগঞ্জ গ্রাম। আর ঘাট অর্থাৎ বনপথ পাহারার দায়িত্বে থাকা অতীতের সৈন্যবাহিনীর বন্দুক নিশানা করার চাঁদমারী মাঠ বর্তমানে চাষের জমি।”দমদমা” এখন ইতিহাস।
তথ্যসূত্র:
1). Annals of Rural Bengal: W.W. Hunter.
2). ব্যক্তিগত ক্ষেত্র সমীক্ষা।