বীরভূম জুড়ে মহাসমারোহে রামনবমী উদযাপন: ভক্তি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

শম্ভুনাথ সেন ও সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ

আজ সারা রাজ্যের সাথে সাথে বীরভূম জেলা জুড়ে ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে রামনবমী উৎসব। যদিও রামনবমী উপলক্ষে গতকালই ছিল সরকারি ছুটি। উল্লেখ্য, শ্রীরামচন্দ্রের জন্মকাহিনী ভারতীয় মহাকাব্যের এক অন্যতম পবিত্র অধ্যায়। ত্রেতা যুগে অযোধ্যার রাজা দশরথ পুত্র কামনায় যজ্ঞ করেন। যজ্ঞের প্রসাদ হিসেবে পাওয়া পায়েস গ্রহণ করে রাণী কৌশল্যা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে শ্রীরামচন্দ্রকে জন্ম দেন। দুষ্টের দমন ও ধর্মের রক্ষার জন্য ভগবান বিষ্ণু এই মানব রূপ ধারণ করেছিলেন। প্রসঙ্গত, শ্রীরামচন্দ্রের জন্ম তারিখ এবং সাল নিয়ে পৌরাণিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দুটি মত প্রচলিত রয়েছে। পৌরাণিক তিথি ও হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, রামচন্দ্র ত্রেতা যুগে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে কর্কট লগ্নে এবং পুনর্বসু নক্ষত্রে জন্মগ্রহণ করেন। আধুনিক গবেষক এবং ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অন বেদাস’ (I-SERVE)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, রামচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল খ্রীস্টপূর্ব ৫,১১৪ অব্দের ১০ জানুয়ারি।
উল্লেখ্য, এবার ২০২৬ সালে ভারতে রামনবমী উৎসবটি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালিত হচ্ছে ২৬ এবং ২৭ মার্চ।
সিউড়ি থেকে বোলপুর, রামপুরহাট থেকে দুবরাজপুর— জেলার সর্বত্রই সকাল থেকে এদিন উৎসবের আমেজ ও শোভাযাত্রা। বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্তে সকাল থেকেই রাম মন্দিরে বিশেষ পূজা-অর্চনার আয়োজন করা হয়। সিউড়ি, রামপুরহাট, বোলপুর, মুরারই, দুবরাজপুর, ইলামবাজার সহ জেলার প্রায় সর্বত্রই বের করা হয়েছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। সুসজ্জিত ট্যাবলো, শঙ্খধ্বনি এবং জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে আকাশ-বাতাস। উৎসবে শামিল হতে গ্রাম-গঞ্জ থেকে প্রচুর মানুষ ভিড় জমিয়েছেন শহরগুলোতে। উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বীরভূম জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং বড় মিছিলগুলোর গতিবিধির ওপর ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হয়।


রামনবমীর এই পবিত্র দিনটি বীরভূমের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ভক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে মানুষ এই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন। দুবরাজপুরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় দেখা যায় এক বিরল দৃশ্য। পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটেন বিজেপি প্রার্থী অনুপকুমার সাহা এবং তৃণমূলের প্রার্থী নরেশচন্দ্র বাউরি। একে অপরকে জড়িয়েও ধরেন। দুবরাজপুর এবং ইলামবাজারে রামনবমীর সকালে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার ছবি ধরা পড়েছে নয়াপ্রজন্মের ওয়েবসাইটের ক্যামেরায়—!

বীরভূমের মুরারই বাজারে হনুমান মন্দির থেকে রাম নবমীর শোভাযাত্রা বের হয়। গোটাবাজার পরিক্রমার পর ভাদীশ্বর বাসস্ট্যান্ডে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় পা মিলিয়েছেন বিধায়ক স্থানীয় ডাঃ মোশারফ হোসেন, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বিপ্লব শর্মা এবং বীরভূম জেলা পরিষদ সদস্য প্রদীপ কুমার ভকত, বিশিষ্ট সমাজসেবী রহমান, হনুমান মন্দিরের সদস্য অরিন দত্ত ও কিশোর পিপাড়া প্রমুখ।

জেলার অন্যান্য প্রান্তের ন্যায় খয়রাশোল ব্লকের লোকপুরেও শুক্রবার বিকেলে রামনবমী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। এদিন লোকপুর মহামায়া মন্দির থেকে বাদ্যযন্ত্র সহযোগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাটি লোকপুর বাস স্ট্যান্ড, নিচে পাড়া সহ বিভিন্ন এলাকা পরিক্রমা করে পুনরায় মহামায়া মন্দিরে সমাপ্ত হয়। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের জল, শরবত, মিষ্টি, প্রসাদ ইত্যাদি খাওয়ানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *