বিধানসভায় সরব বীরভূমের দুই বিধায়ক: অজয়ের উপর দুটি সেতু নির্মাণ ও সাঁইথিয়া হাসপাতালে উন্নয়নের জোরালো দাবি

সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ

বুধবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টি আকর্ষণ পর্বে বীরভূম জেলার উন্নয়ন সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরলেন জেলার দুই বিধায়ক। দুবরাজপুরের বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা অজয় নদীর উপর দুটি নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানান। অন্যদিকে সাঁইথিয়ার বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা সাঁইথিয়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালের পরিকাঠামো ও স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল চিত্র তুলে ধরে স্বাস্থ্য দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
দুবরাজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা তাঁর বক্তব্যে বলেন, বীরভূম ও পশ্চিম বর্ধমান জেলার সংযোগকারী অজয় নদ পারাপারে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কাজে প্রতিদিন বহু মানুষ দুই জেলার মধ্যে যাতায়াত করেন। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের অস্থায়ী বালিমাটি বা বাঁশের সাঁকোর উপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষাকালে নদীর জল বেড়ে গেলে সেই অস্থায়ী পথ ভেঙে পড়ে, ফলে যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যদিও ভীমগড়–পান্ডবেশ্বর এলাকায় অজয় নদীর উপর একটি সেতু রয়েছে, তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেটি ব্যবহার করতে অনেকটাই ঘুরপথে যেতে হয়। ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে নৌকায় নদী পারাপার করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণও বটে।
এই পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বিধায়ক দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের দাবি জানান। প্রথমটি খয়রাসোল ব্লকের বিনুই ঘাট থেকে পশ্চিম বর্ধমানের জামুরিয়া বিধানসভার দরবারডাঙা ঘাট পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়টি দুবরাজপুর ব্লকের লোবা অঞ্চলের বাবুপুর ঘাট থেকে পশ্চিম বর্ধমানের গৌরবাজার ঘাট পর্যন্ত।
তিনি বলেন, এই দুটি সেতু নির্মিত হলে দুই জেলার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও দ্রুত, নিরাপদ ও সহজ হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
অন্যদিকে সাঁইথিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাঁইথিয়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বীরভূম জেলার পাথর শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু তাঁদের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা সাঁইথিয়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব রয়েছে। হাসপাতাল ভবন নির্মিত এবং নীল সাদা রং হলেও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বিধায়ক আরও বলেন, রামপুরহাট, মহম্মদবাজার এবং পার্শ্ববর্তী পাথর শিল্পাঞ্চলের বহু শ্রমিক সিলিকোসিস-সহ বিভিন্ন জটিল শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হলেও তাঁদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, সাঁইথিয়া বিধানসভা কেন্দ্রটি তপশিলি জাতি ও তপশিলি উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসকরা যে ওষুধ লিখে দেন, তার অধিকাংশই হাসপাতালের ফার্মেসিতে মজুত থাকে না। ফলে দরিদ্র রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হতে হয়, যা তাঁদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
এছাড়াও তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি চিকিৎসকদের ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে উপস্থিতি নিশ্চিত না হওয়ায় জরুরি রোগীরা অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সাঁইথিয়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে অবিলম্বে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ, সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা পরিষেবা চালু এবং সরকারি চিকিৎসকদের ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানান বিধায়ক কৃষ্ণকান্ত সাহা।
বিধানসভায় জেলার দুই বিধায়কের উত্থাপিত এই দাবিগুলি বাস্তবায়িত হলে বীরভূমের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন জেলার সাধারণ মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *