বীরভূমে ‘গুপ্তধন’ উদ্ধার! মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে ১৫ কেজি সোনা ও সাড়ে ১০ কোটি নগদ, তদন্তের কেন্দ্রে পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল

নয়াপ্রজন্ম প্রতিবেদন:

বীরভূমের পাথর শিল্পকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। সেই অভিযোগের আবহেই এবার বিপুল পরিমাণ সোনা ও নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে জেলাজুড়ে। পুলিসের অভিযানে টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৫ কেজি সোনা এবং সাড়ে ১০ কোটি টাকা নগদ উদ্ধার হয়েছে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে। উদ্ধার হওয়া সোনার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে অভিযান এখনও শেষ হয়নি এবং উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

মধ্যরাত থেকে শুরু মেগা অভিযান

গত মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬ গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এই তল্লাশি অভিযান বুধবারও অব্যাহত ছিল। তদন্তকারী আধিকারিকরা একাধিক আলমারি, লকার ও বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও সোনা উদ্ধার করেন। এখনও পর্যন্ত টাকা গোনার কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে চূড়ান্ত অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল—এই বিপুল সম্পদের প্রকৃত মালিক কে? উদ্ধার হওয়া নগদ অর্থ ও সোনা কি মিনার মণ্ডলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি, নাকি এর সঙ্গে অন্য কারও যোগ রয়েছে? সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

কে এই টুলু মণ্ডল?

বীরভূম জেলার সিউড়ির সনাতনপাড়ার বাসিন্দা টুলু মণ্ডল একসময় সাধারণ জীবনযাপন করতেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০০০ সালের শুরুর দিকে তিনি বাড়িতে ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন। পরবর্তীতে পাথর সরবরাহের ব্যবসায় যুক্ত হন। ধীরে ধীরে সেই ব্যবসা সম্প্রসারণ করে পাথর খাদান ও স্টোন ক্রাশারের ব্যবসায় প্রবেশ করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি জেলার অন্যতম প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠতা ও ডি সি আর বিতর্ক

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত দাবি অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ সালের পর টুলু মণ্ডলের সঙ্গে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। এরপর ২০১৬-১৭ সালের দিকে বীরভূমের পাথর খাদান থেকে আদায় হওয়া ডি সি আর (DCR) বা সরকারি রাজস্ব সংগ্রহের কাজে তাঁর সংস্থার ভূমিকা বাড়ে।

ডি সি আর বলতে পাথর উত্তোলনের উপর সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব বা ট্যাক্স সংগ্রহকে বোঝায়। এই রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ, যার সঙ্গে টুলু মণ্ডলের নাম জড়িয়ে রয়েছে।

বহুদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, ডি সি আর বাবদ যে পরিমাণ অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা পড়ার কথা, বাস্তবে তার তুলনায় অনেক কম অর্থ জমা পড়ত। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, এই খাতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বিরোধীদের অভিযোগ

বিজেপির দাবি, বর্তমানে পাথর শিল্প থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় হচ্ছে। অথচ অতীতে সরকারের কোষাগারে দৈনিক মাত্র ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা জমা পড়ত। বিরোধীদের অভিযোগ, বাকি বিপুল অঙ্কের অর্থ সরকারি হিসাবে না গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের হাতে পৌঁছত।

তবে এই দাবিগুলি রাজনৈতিক অভিযোগ মাত্র এবং সেগুলির স্বাধীন সরকারি বা বিচারিক যাচাই এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

আড়ম্বরপূর্ণ বিয়ে নিয়েও বিতর্ক

টুলু মণ্ডলের বিপুল সম্পদের প্রসঙ্গ আগেও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিজের মেয়ের বিয়েতে তিনি প্রায় ১০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে বলিউড ও টলিউডের একাধিক তারকার উপস্থিতি ছিল বলে দাবি করা হয়। এছাড়াও তাঁর ভাইয়ের মেয়ের বিয়েতেও বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।

যদিও এই ব্যয়ের পরিমাণের স্বাধীন সরকারি প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই, তবুও তাঁর দ্রুত উত্থান এবং বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন উঠেছে।

কে এই মিনার মণ্ডল?

সম্প্রতি যার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল নগদ ও সোনা উদ্ধার হয়েছে, সেই মিনার মণ্ডল টুলু মণ্ডলের আত্মীয়। পারিবারিক সম্পর্ক অনুযায়ী, মিনার মণ্ডল টুলু মণ্ডলের খুড়তুতো বোনের স্বামী।

তদন্তকারী সূত্রের দাবি, পাথর খাদান থেকে বের হওয়া ট্রাকগুলির ডি সি আর সংগ্রহের জন্য যে টোল সদৃশ গেট ছিল, সেই গেট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মিনার মণ্ডল। অভিযোগ, এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হতো। তবে সেই অর্থের উৎস, বৈধতা এবং প্রকৃত মালিকানা নিয়ে তদন্ত চলছে।

তদন্তের মূল প্রশ্ন

তদন্তকারীদের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—

  • উদ্ধার হওয়া ১৫ কেজি সোনা ও সাড়ে ১০ কোটি নগদ অর্থের প্রকৃত মালিক কে?
  • এই সম্পদের উৎস কী?
  • ডি সি আর সংগ্রহে কোনও আর্থিক অনিয়ম বা সরকারি রাজস্ব তছরুপের যোগ রয়েছে কি?
  • এই ঘটনায় আর কারা জড়িত?

এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখেই তদন্তকারীরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে জানা গেছে।

এখনও তদন্ত চলছে

তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযান এখনও শেষ হয়নি। উদ্ধার হওয়া অর্থ ও নথিপত্র পরীক্ষা করে আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির দিকগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এই ঘটনায় এখনও তদন্ত চলছে। উদ্ধার হওয়া অর্থ ও সোনার মালিকানা, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই প্রকৃত তথ্য স্পষ্ট হবে।

ভিডিও সৌজন্য: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর অফিসিয়াল X (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *