দুবাইয়ে পলাতক টুলু মণ্ডল! রেড কর্নার নোটিসের উদ্যোগ, তদন্তে বীরভূম পুলিশ ও ইডি

নয়াপ্রজন্ম প্রতিবেদনঃ

বীরভূমের বহুল আলোচিত নগদ অর্থ, সোনা উদ্ধার এবং পাথর ব্যবসা সংক্রান্ত মামলার তদন্তে আরও গতি এনেছে বীরভূম জেলা পুলিশ। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ও পলাতক তৃণমূল নেতা টুলু মণ্ডল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার কিছুদিন আগেই দেশ ছেড়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) দুবাইয়ে পালিয়ে গিয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেড কর্নার নোটিস (RCN) জারির প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ।

ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে প্রত্যর্পণ (Extradition) চুক্তি কার্যকর থাকায়, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে টুলু মণ্ডলকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তদন্তকারী মহলের ধারণা।

মঙ্গলকোটে ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বাড়িতে তল্লাশি

তদন্তের অগ্রগতির অংশ হিসেবে রবিবার পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটের আইমাপাড়ায় টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও আত্মীয় ইফাজুল হকের পৈতৃক বাড়িতে তল্লাশি চালায় বীরভূম পুলিশের একটি বিশেষ দল। অভিযানে বাড়ি থেকে একাধিক ট্রাঙ্ক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ওই ট্রাঙ্কগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ নথি, নগদ অর্থ বা অন্য কোনও মূল্যবান সামগ্রী রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ইফাজুল হক দীর্ঘদিন ধরে টুলু মণ্ডলের পাথর খনি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার দেখভাল করতেন। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে সিউড়িতে থাকলেও সম্প্রতি মঙ্গলকোটের পৈতৃক বাড়িতে ফিরে আসেন। তবে পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর আগেই তিনি আত্মগোপন করেন বলে অভিযোগ।

মিনার মণ্ডলের বাড়িতে অভিযানের পর থেকেই নিখোঁজ

তদন্তকারীদের দাবি, দেওচা গ্রামের মিনার মণ্ডলের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর পর থেকেই ইফাজুল হকের হদিশ মিলছে না। ওই অভিযানের পর থেকেই তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে পুলিশের অনুমান।

চালক ও হিসাবরক্ষক আটক

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের খোঁজে টুলু মণ্ডলের ব্যক্তিগত চালককে আটক করেছে পুলিশ। অভিযোগ, মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি তিনি গোপন করেছিলেন। পাশাপাশি টুলু মণ্ডলের হিসাবরক্ষক কাউসার মোল্লাকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক নথি এবং সম্পত্তির উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ তদন্তকারী দল

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, টুলু মণ্ডলের অবস্থান চিহ্নিত করতে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক বিশেষ তদন্তকারী দল পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁর ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগের দিকগুলি খতিয়ে দেখছেন।

সরকারি নির্মাণ প্রকল্পেও তদন্ত

শুধু পাথর ব্যবসাই নয়, টুলু মণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পও তদন্তের আওতায় এসেছে। দুর্গাপুর ও ঝাড়খণ্ডে গণপূর্ত (PWD)-এর কাজ, রাস্তা, সেতু, জাতীয় সড়ক এবং বাঁধ নির্মাণের একাধিক প্রকল্পে তাঁর সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তকারী সংস্থার সন্দেহ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রকল্পের কাজের বরাত নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তোলা হয়েছিল।

নেপালে পালানোর সময় গ্রেপ্তার ভাগ্নে

এদিকে টুলু মণ্ডলের ভাগ্নে শেখ ওয়াসিমকে দার্জিলিং থেকে গ্রেপ্তার করেছে রামপুরহাট পুলিশ। পুলিশের দাবি, তিনি নেপালে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে বীরভূমে এনে আদালতে তোলা হলে আট দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বর্তমানে জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (ASP) এবং ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (DSP)-সহ একাধিক উচ্চপদস্থ আধিকারিক তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তদন্তকারীদের আশা, তাঁর কাছ থেকে টুলু মণ্ডলের বর্তমান অবস্থান, পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।

আরও নগদ অর্থ ও সোনা উদ্ধারের সম্ভাবনা

পুলিশের ধারণা, এই মামলায় এখনও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসা বাকি। তদন্তকারীদের বিশ্বাস, বিভিন্ন স্থানে আরও নগদ অর্থ, সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে রাখা থাকতে পারে। সেই কারণে সম্ভাব্য একাধিক জায়গায় তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ইডির তদন্তের সম্ভাবনা

সূত্রের খবর, আগামী সপ্তাহে নয়াদিল্লি থেকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর একটি দল বীরভূমে এসে তদন্তে যোগ দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সোনা পাচার, অর্থপাচার এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের দিকগুলি নিয়ে তারা পৃথকভাবে তদন্ত চালাবে বলে জানা গিয়েছে।

তদন্তের সূত্রপাত যেভাবে

এই তদন্তের সূত্রপাত হয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হাতে আব্দুল বারিক বিশ্বাস গ্রেপ্তার হওয়ার পর। এরপর দেওচা গ্রামের মিনার মণ্ডলের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ দাবি করে, তারা ৯৯৯.৯৯ বিশুদ্ধতার এবং সুইজারল্যান্ড ও দুবাইয়ের চিহ্নযুক্ত একাধিক সোনার বার উদ্ধার করেছে। সেই ঘটনার পর থেকেই তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয় এবং আন্তর্জাতিক সোনা পাচার চক্রের সম্ভাব্য যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা শুরু হয়।

তদন্তের বর্তমান অগ্রাধিকার

বর্তমানে তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য হলো টুলু মণ্ডলের অবস্থান নির্ণয়, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক অর্থ ও সোনা পাচার চক্রের সঙ্গে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটন করা। একই সঙ্গে আত্মগোপনে থাকা সহযোগী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের খোঁজেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *