এক রাত্রির আলোকমালায় বীরভূমের তাঁতিপাড়া গ্রাম : ৩০০ বছরের প্রাচীন রক্ষাকালী পুজোয় অগণিত ভক্তের ঢল

শম্ভুনাথ সেনঃ

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ! কিন্তু বীরভূমের রাজনগর ব্লকের অন্তর্গত তাঁতিপাড়া গ্রামের মানুষজনদের কাছে বছরের একটি বিশেষ রাত সব উৎসবকে ছাপিয়ে যায়। চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে, ১১ এপ্রিল অন্তত ৩০০ বছরের প্রাচীন এক রহস্যময়ী ‘রক্ষাকালী’ পূজাকে কেন্দ্র করে উৎসবে মাতোয়ারা হয় গোটা গ্রাম। সন্নিহিত গোহালিয়ারা, বক্রেশ্বর, রাজগঞ্জ, করমকাল, পণ্ডিতপুর, চন্দ্রপুর, রাজনগর থেকেও উপস্থিত হন হাজার হাজার ভক্ত। এই পূজার বিশেষত্ব হলো এর স্বল্পস্থায়ী অথচ আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন।


লোকগাথা অনুযায়ী, কয়েক শতাব্দী আগে এলাকায় মহামারী প্রাণঘাতী রূপ নিলে এক অজ্ঞাতপরিচয় সন্ন্যাসী এই পূজার বিধান দেন। সেই থেকেই গ্রামকে রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখতে এই আরাধনা চলে আসছে। পূজাটি আক্ষরিক অর্থেই ‘এক রাত্রির’। এদিনই সূর্যাস্তের পর প্রতিমা নির্মাণ শুরু করে স্থানীয় শিল্পী স্বপন সূত্রধর এবং সারা রাত চলে শাস্ত্রীয় মতে পূজা-অর্চনা, আচার-অনুষ্ঠান। পরম্পরা ভাবে পৌরহিত্য করেন স্বর্গীয় বিজয় ঠাকুরের পরিবারের পুরোহিতরা। ১৫ হাজার গ্রামবাসীর পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-পরিজনদের সমাগমে তাঁতিপাড়া হাটতলা এলাকা এক মহামিলন মেলায় পরিণত হয়। এদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় বিদায়ের সুর। সূর্যোদয়ের পূর্বে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে, বর্ণাঢ্য আলোকসজ্জা ও বাদ্যযন্ত্রের তালে শোভাযাত্রা সহকারে এলাকার বাঁধাপুকুরে দেবীকে বিসর্জন দেওয়া হয়। অশ্রুসজল চোখে ভক্তরা প্রার্থনা করেন— “সবাইকে ভালো রেখো মা, আবার এসো।” ইতিহাস আর বিশ্বাসের এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে তাঁতিপাড়া গ্রামের এই রক্ষাকালী পূজা আজও বীরভূমের সংস্কৃতির এক অনন্য পরিচয় বহন করে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *