
শম্ভুনাথ সেনঃ
ভোরের নতুন সূর্য জানান দিয়েছে —আজ পয়লা বৈশাখ। আজ বাঙালির দ্বারে সমাগত “১৪৩৩” বঙ্গাব্দ। পঞ্জিকার পাতা উল্টে নতুন বছরে পা রাখল বাংলা ও বাঙালি। বাঙালির তেরো পার্বণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব নববর্ষ। তবে এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘হালখাতা’। ডিজিটাল লেনদেনের এই যুগেও লাল কাপড়ে বাঁধানো সেই পুরনো খাতার ঐতিহ্য আজও অম্লান।

মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে শুরু হওয়া এই প্রথা আজও গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র বাঙালির ব্যবসায়িক আভিজাত্যের প্রতীক। জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুন বছরের হিসাব শুরু করার এই বিশেষ রীতিটি কেবল পাওনা মেটানোর দিন নয়, বরং ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে এক মধুর সামাজিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। সকাল থেকেই পাড়ার ছোট-বড় দোকানগুলোতে দেখা যায় সাজ সাজ রব। দরজায় টাটকা গাঁদা ফুলের মালা, কলার গাছ আর মাঙ্গলিক স্বস্তিক চিহ্ন। ধূপ-ধুনোর গন্ধে আমোদিত হয় বাতাস। বীরভূমের তারাপীঠে মা তারার মন্দির, জয়দেব কেন্দুলীতে রাধাবিনোদের মন্দির, দুবরাজপুরে সতীপীঠ বক্রেশ্বরের বক্রনাথ মন্দিরে ব্যবসায়ীদের ভিড়। মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিয়ে ব্যবসায়ীরা নতুন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে দোকানে বসেন।

হালখাতা মানেই মিষ্টির সুবাস। বোঁদে, রসগোল্লা থেকে শুরু করে হরেক রকমের সন্দেশ দিয়ে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করা হয়। অনেক দোকানেই ক্রেতাদের ক্যালেন্ডার বা ডায়েরি উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আজও টিকে আছে।স্মার্টফোন আর অনলাইন পেমেন্টের যুগে হয়তো খাতার রং বদলেছে, অনেকে কম্পিউটারের স্প্রেডশিটে হিসাব রাখেন, কিন্তু ‘শুভ হালখাতা’ লেখা সেই লাল শালুর বাঁধানো খাতার প্রতি বাঙালির এক অমোঘ টান রয়েছে। গনেশ পুজোর মন্ত্র আর চন্দনের ফোঁটায় সিক্ত হয়েই শুরু হয় নতুন বছরের নতুন যাত্রা। “হালখাতা আসলে কেবল দেনা-পাওনার হিসাব নয়, এটি বাঙালির বিশ্বাস আর নতুন করে পথচলার অঙ্গীকার। হালখাতা উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রার্থনা করে –“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা”।

