পঞ্চায়েত প্রধানের অনুপস্থিতিতে জনপরিষেবা ব্যাহত, উঠছে নানা প্রশ্ন লোকপুরে

সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ

রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। নির্বাচনের ফল প্রকাশের প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ ও পৌর সংস্থার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রেই বিঘ্নিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় পৌরপ্রধান, কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধান ও সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনাও সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে খয়রাশোল ব্লকের লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রধানের দীর্ঘ অনুপস্থিতি ঘিরে জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, জানিচিনি শংসাপত্র, ওয়ারিশেন সার্টিফিকেট সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিষেবা পেতে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি পঞ্চায়েতের দৈনন্দিন কাজকর্ম ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নেও তার প্রভাব পড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।


সম্প্রতি খয়রাশোল ব্লকের মধ্যে প্রথম লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা (এমজিএনআরইজিএ) প্রকল্পের আওতায় পুকুর খনন কাজের শুভ উদ্বোধন করেন দুবরাজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা। অনুষ্ঠানে ব্লক প্রশাসনের আধিকারিক, পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য এবং গ্রামবাসীরা উপস্থিত থাকলেও পঞ্চায়েত প্রধানের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা বলেন, “উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি আধিকারিক থেকে শুরু করে পঞ্চায়েতের অন্যান্য সদস্য ও গ্রামবাসীরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু প্রধানের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন তুলছে। প্রতিদিন বহু মানুষ বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করানো বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে প্রধানের কাছে আসেন। উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রেও প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি কেন আসছেন না, সেই উত্তর তিনিই দিতে পারবেন। তবে তিনি যেহেতু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং এখনও প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন, তাই তাঁর নিয়মিত উপস্থিত থাকা উচিত।” তিনি আরও বলেন, “যদি কোনও কারণে দায়িত্ব পালন করতে অসুবিধা হয়, তাহলে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। কিন্তু পঞ্চায়েত সচল রাখতে হবে এবং সাধারণ মানুষ যাতে পরিষেবা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন সরকার গঠনের পর আমরা চাই পঞ্চায়েত প্রকৃত অর্থে মানুষের পঞ্চায়েত হয়ে উঠুক। সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”


লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট সুজিত কুমার পালও স্বীকার করেছেন যে প্রধানের অনুপস্থিতির কারণে পরিষেবা প্রদানে চাপ বাড়ছে। তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই জরুরি নথিতে স্বাক্ষরের জন্য পঞ্চায়েতের কর্মীদের প্রধানের বাড়িতে পাঠাতে হচ্ছে। ফলে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে।”
অন্যদিকে, পঞ্চায়েত প্রধান রূপা গোপ তাঁর অনুপস্থিতির পেছনে ভিন্ন কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় এক ধরনের আতঙ্ক ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি একজন মহিলা প্রধান। পরিস্থিতি নিয়ে ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম। তবুও পঞ্চায়েতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে হেনস্থার শিকার হতে হয়। আমাকে পঞ্চায়েত অফিস থেকে বাইরে বের করে দেওয়া হয় এবং অফিসে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। বিষয়টি আমি লোকপুর থানার ওসি, বিডিও এবং পঞ্চায়েতের এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্টকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তখন কেউই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি।” এমজিএনআরইজিএ প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, “অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টা আগে আমাকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। এত অল্প সময়ে প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আগে থেকে জানানো হলে অবশ্যই উপস্থিত থাকতাম।”


লোকপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে সাধারণ মানুষের পরিষেবা প্রাপ্তির প্রশ্ন, অন্যদিকে প্রধানের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়—উভয় দিকেই দ্রুত সমাধানের দাবি উঠছে। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক মতভেদ যাই থাকুক না কেন, পঞ্চায়েতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং জনপরিষেবা অব্যাহত রাখা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *