নয়াপ্রজন্ম প্রতিবেদনঃ
পশ্চিমবঙ্গ সরকার যখন ঘটা করে ঘোষণা করলেন যে রাজ্যের সব সরকারি বাসে মহিলারা এবার থেকে একদম ‘ফ্রি’-তে যাতায়াত করবেন, তখন চারদিকে যেন শাঁখের আওয়াজ আর উলুধ্বনি পড়ে গেল! বাস কন্ডাক্টরের গম্ভীর “আরে দাদা, খুচরো দিন” চিল্লানির জায়গায় শোনা গেল মধুর “আসুন দিদি, ফ্রিতে বসুন”। মহানগরী থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই দিদি-বোনেরা এই “জিরো-ভ্যালু টিকিটের” মহিমায় গদগদ। কিন্তু, মুফতের চন্দন নাকি ক্ষয় বেশি? স্কিম চালুর কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই বোঝা যাচ্ছে, পরিবহণ ব্যবস্থার কলকব্জা ঢিলে হতে শুরু করেছে।
বেসরকারি বাস মালিকদের কান্না: “আমারে ছাইড়া গেলি কোথা রে!”
সরকারি বাস সংস্থাগুলো (WBTC, NBSTC, SBSTC) তো সরকারি ভর্তুকির অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে বহাল তবিয়তে আছে। কিন্তু ফাঁপরে পড়েছেন বেসরকারি বাসের মালিকরা। বাংলার পরিবহণের আসল মেরুদণ্ড তো ওরাই—প্রায় ৮৫% যাত্রী ওরাই টানে। কিন্তু এখন সরকারি বাস দেখলেই মহিলারা যেভাবে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-র সিমরানের মতো দৌড় লাগাচ্ছেন, তাতে বেসরকারি বাসের ক্যাশ বক্সের অবস্থা এখন মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে।
বাস সিন্ডিকেটের কর্তারা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তাঁদের বক্তব্য: ”আগে মায়েরা যখন বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন, দিনে চারবার টিকিট কাটতেন। আমাদের লক্ষ্মীলাভ হতো। এখন সরকারি বাস দেখলেই তাঁরা উইশেন বোল্টকে হারিয়ে ফ্রিতে উঠে পড়ছেন। আমাদের কপালে শুধু পড়ে থাকছে শূন্য খাঁচা আর প্রতিদিনের ৫০০-৭০০ টাকার লোকসান!”
২০১৮ সালের পর থেকে বাসের ভাড়া বাড়েনি, এদিকে ডিজেলের দাম রকেটের গতিতে ছুটছে। বেসরকারি বাস মালিকদের অবস্থা এখন সেই ব্যর্থ প্রেমিকের মতো—যে শুধু দূর থেকে দেখছে তার প্রিয় যাত্রীরা কীভাবে অন্য বাসে (সরকারি) ফ্রিতে চেপে চলে যাচ্ছে!
বাদুড়ঝোলা ভিড় ও কন্ডাক্টরের ‘কেবিসি’ খেলা
ফ্রি স্কিম চালুর পর সরকারি বাসে মহিলা যাত্রী এক ধাক্কায় ১৪% বেড়ে গেছে। কিন্তু বাস কোথায়? কোভিডের পর থেকে সরকারি বাসের সংখ্যা এমনিতেই ডাইনোসরের মতো বিলুপ্তপ্রায়। ফলে এখন একটা সরকারি বাস আসা মানে যেন স্বয়ং ভগবানের দর্শন পাওয়া!
অফিস টাইমে বাসের গেটে যে যুদ্ধ চলছে, তা দেখলে অলিম্পিকের কুস্তিগীররাও ভয় পেয়ে যাবেন। সল্টলেকের এক আইটি কর্মী যেমন আক্ষেপ করে বললেন: ”কাগজে-কলমে স্কিমটা দারুণ! কিন্তু যে দিন রাস্তায় একটাও সরকারি বাস থাকে না, সে দিন কি আমরা ডানা মেলে উড়ে অফিসে যাব?”
সবচেয়ে করুণ দশা কন্ডাক্টরের। একদিকে ভাঙা ই-টিকিট মেশিন, অন্যদিকে যাত্রীদের জমা দেওয়া ১১ রকমের পরিচয়পত্র (আধার, ভোটার, রেশন ইত্যাদি) ভেরিফাই করা। বাসের ঝাঁকুনিতে টিকিট কাটা বাদ দিয়ে কন্ডাক্টরবাবু এখন বাসের মধ্যেই অমিতাভ বচ্চনের মতো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’-র রিয়েলিটি শো চালাচ্ছেন—”দেখি দিদি, আপনার আধার কার্ডের ছবিটার সাথে মুখের মিল আছে কি না!”
রাজকোষের পকেট গড়ের মাঠ
জনকল্যাণ করতে গিয়ে সরকারের পকেটের যা অবস্থা, তাতে অর্থমন্ত্রী হয়তো রাতে ঘুমোতে গিয়েও বাসের হর্ন শুনছেন। সরকার আপাতত এই ফ্রি সফরের জন্য ১২ কোটি টাকা ছুঁড়ে দিয়েছে বটে, কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, “বাবু খাবে তো রোজ, টাকা আসবে কোত্থেকে?”
সমালোচকরা বলছেন, সব টাকা যদি ‘ফ্রি টিকিট’-এর পেছনেই চলে যায়, তবে রাস্তার খানাখন্দ সারাবে কে? জরাজীর্ণ বাস টার্মিনালগুলোর দশা এখন ভূতুড়ে বাড়ির মতো। নতুন বাস কেনা দূর অস্ত, পুরনো বাসগুলোর কলকব্জা যেভাবে নড়ছে, তাতে মনে হয় বাস নয়, যেন আস্ত একটা মিক্সার গ্রাইন্ডার রাস্তায় চলছে!
আগামী দিনের পথ: গন্তব্য কোথায়?
বাংলার পরিবহণ ব্যবস্থা আসলে একটা ভাঙা সাইকেলের মতো, যা সরকারি আর বেসরকারি—দুই চাকার ব্যালেন্সে চলত। এখন এক চাকায় অতিরিক্ত হাওয়া দিতে গিয়ে অন্য চাকাটাই পাংচার হওয়ার জোগাড়! মহিলাদের ক্ষমতায়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু তাই বলে বাস ব্যবস্থাটাই যদি ‘খেল খতম’ হয়ে যায়, তবে দিদিরা ফ্রিতে চড়বেন কিসে?
তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সরকার যদি তাড়াতাড়ি বাসের সংখ্যা না বাড়ায় আর বেসরকারি বাসগুলোকে একটু ‘দয়া’ না করে, তবে আগামী দিনে মহিলারা ফ্রি টিকিটের আনন্দ নিয়ে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বুড়িয়ে যাবেন, কিন্তু বাস আর আসবে না!
