মিড ডে মিলের (PM POSHAN) দায়িত্বে ইসকন, মেনু থেকে বাদ পড়ছে ডিম: রাজ্য জুড়ে তীব্র বিতর্ক ও নতুন সমীকরণ

নয়াপ্রজন্ম প্রতিবেদনঃ

রাজ্য বাজেট পেশের পরপরই শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বড়সড় সংস্কার ও পরিবর্তনের পথে হাঁটল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কলকাতা পুরনিগম (KMC) এলাকার সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলগুলোর মিড ডে মিল রান্নার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সংস্থা ‘ইসকন’ (ISKCON)-এর চ্যারিটেবল উইং ‘অন্নমৃত ফাউন্ডেশন’-এর হাতে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের সাথে সাথেই রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে এক তীব্র সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিড ডে মিলের মেনু থেকে ‘ডিম’ বাদ পড়া এবং হাজার হাজার বর্তমান রান্নার কর্মীর কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ।

গত সোমবার বিধানসভায় রাজ্যের বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত এই বড় ঘোষণাটি করেন। তিনি জানান, প্রাথমিকে পড়ুয়া পিছু মিড ডে মিলের বরাদ্দ ৬.৭৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০.০০ টাকা করা হয়েছে এবং কলকাতার স্কুলগুলোতে পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন খাবার সরবরাহের জন্য ইসকনকে যুক্ত করা হচ্ছে।

ডিমোক্রেসি’ বনাম নিরামিষ মেনু: বিতর্ক কেন?

রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে চলেছে পড়ুয়াদের চেনা মেনুর ওপর। বাংলায় এতদিন সপ্তাহে অন্তত একদিন মিড ডে মিলে ডিম দেওয়া হতো। কিন্তু ইসকনের ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী তাদের রান্না সম্পূর্ণ নিরামিষ (পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া)। ফলে মেনু থেকে ডিম পুরোপুরি বাদ পড়তে চলেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ‘ডিমোক্রেসি’ বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছেন রাজ্যের পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের একাংশ। তাদের মতে, নিরামিষ খাবারে পুষ্টি থাকলেও বাড়ন্ত বয়সের শিশুদের জন্য ডিমের বিকল্প পাওয়া কঠিন।

মিড ডে মিলে ডিমের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা:

  • প্রথম শ্রেণীর প্রোটিন: ডিম হলো ‘কমপ্লিট প্রোটিন’ (Complete Protein), যাতে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ৯টি এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিডই সঠিক অনুপাতে থাকে। নিরামিষ প্রোটিনের তুলনায় শরীর ডিমের প্রোটিন অনেক সহজে ও দ্রুত গ্রহণ করতে পারে।
  • মস্তিষ্কের বিকাশ (Choline): ডিমে প্রচুর পরিমাণে ‘কলিন’ (Choline) থাকে, যা শিশুদের মস্তিষ্কের কোষ গঠন, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক বুদ্ধির বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
  • ভিটামিন ও খনিজের ভাণ্ডার: ডিমে রয়েছে ভিটামিন D (হাড়ের গঠনের জন্য), ভিটামিন B12, আয়রন এবং জিঙ্ক। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা দূর করতে ডিম দারুণ কাজ করে।
  • স্বল্প খরচে সহজলভ্য: কম খরচে এত উচ্চমানের পুষ্টির উৎস আর দ্বিতীয়টি নেই। প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলেও ডিম সহজে সংরক্ষণ ও পরিবেশন করা যায়।

ডিম খাওয়ার কিছু নেতিবাচক দিক ও ঝুঁকি: অন্যদিকে, ইসকন কর্তৃপক্ষ ও একদল পুষ্টিবিজ্ঞানীর মতে, মিড ডে মিলের মেনু থেকে ডিম বাদ দেওয়ার পেছনে ধর্মীয় কারণ নয়, বরং কিছু স্বাস্থ্যগত ও গুণগত যুক্তি আছে:

  • অ্যালার্জির ঝুঁকি: শিশুদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ফুড অ্যালার্জির (Food Allergy) কারণ হলো ডিম। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ডিম খাওয়ার পর ত্বকে র‍্যাশ বা পেটের সমস্যা দেখা দেয়।
  • ব্যাকটেরিয়া ও ফুড পয়জনিং: গরমের দিনে বা সঠিক সংরক্ষণের অভাবে ডিমে খুব দ্রুত ‘সালমোনেলা’ (Salmonella) ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে। অতীতে মিড ডে মিলের পচা বা নিম্নমানের ডিম খেয়ে শিশুদের অসুস্থ হওয়ার একাধিক রেকর্ড রয়েছে।
  • কোলেস্টেরল ও হজমের সমস্যা: ডিমের কুসুমে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল থাকে, যা প্রতিদিনের হজমশক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত উষ্ণ আবহাওয়াপ্রবণ এই রাজ্যে বর্ষা বা গ্রীষ্মকালে শিশুদের পেটের গোলমালের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় ডিম।

ইসকন কলকাতার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাধারমণ দাস অবশ্য জানিয়েছেন, ডিমের বিকল্প হিসেবে সয়াবিন, পনির, রাজমা, ছোলা ও ডাল দিয়ে প্রোটিন ও ক্যালোরির ভারসাম্য বজায় রাখা হবে, যা শিশুদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ ও সহজে হজমযোগ্য।

বিদ্যমান স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও রান্নার কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়

এই সিদ্ধান্তের পর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও মানবিক প্রশ্নটি উঠছে স্কুলের বর্তমান রান্নার কর্মী ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির (Self Help Groups) ভবিষ্যৎ নিয়ে। এতদিন কলকাতার সরকারি স্কুলগুলোতে রান্নার দায়িত্বে ছিলেন হাজার হাজার স্থানীয় মহিলা, যাদের বহুলাংশই অত্যন্ত দরিদ্র এবং এই কাজের সাম্মানিকের ওপর নির্ভরশীল।

যেহেতু ইসকন তাদের নিজস্ব আধুনিক এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ‘সেন্ট্রাল কিচেন’ (Central Kitchen) থেকে রান্না করা খাবার সরাসরি গাড়ি করে স্কুলে সরবরাহ করবে, তাই স্বাভাবিকভাবেই স্কুলগুলোতে রান্নার কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের ফলে এক ধাক্কায় বহু দরিদ্র কর্মীর রুজি-রুটিতে টান পড়বে।

তবে শিক্ষা দপ্তর সূত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, স্কুলগুলোতে রান্না না হলেও ইসকনের পাঠানো খাবার শিশুদের থালাতে পরিবেশন করা, পরিকাঠামো দেখাশোনা ও লজিস্টিকস সামলানোর কাজে এই বর্তমান কর্মীদের একটি বড় অংশকে বিকল্প উপায়ে যুক্ত রাখা হবে। তবে এই বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট সরকারি নির্দেশিকা জারি না হওয়ায় কর্মীদের মনে তীব্র উদ্বেগ রয়েছে।

কড়া সমালোচনা বিরোধীদের ও অনড় প্রশাসন

রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন সমাজমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “মিড ডে মিল থেকে ডিম বাদ দিয়ে শিশুদের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং জোর করে নিরামিষ আহার চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলা এটা মেনে নেবে না।” দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষও সরকারের কাছে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার এবং বর্তমান রান্নার কর্মীদের কাজ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আমরা মিড ডে মিল রান্নার দায়িত্ব ইসকনকে দিচ্ছি যাতে শিশুরা অত্যন্ত গুণমানসম্পন্ন ও শুদ্ধ খাবার পায়। আপনারা নিজেরা খেয়ে পরীক্ষা করে দেখুন। আর আপনাদের কাউকেই ‘হরে কৃষ্ণ’ নাম জপ করতে বলা হচ্ছে না।” শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনও জানিয়েছেন, নিরামিষ খাবার খেয়েও মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ ও পুষ্ট থাকতে পারে, তাই ডিম অপরিহার্য— এমন ভাবনার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

আগামী এক থেকে দু’মাসের মধ্যে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কলকাতায় এই নতুন ব্যবস্থা চালু হতে চলেছে। তবে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের কর্মসংস্থান রাজ্য সরকার কীভাবে রক্ষা করে, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *