তাজিয়া-নিশান শোভাযাত্রায় জেলার বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত মহরম

সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ

ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় সাড়ে তেরো শত বছর আগে আরবি সালের মহরম মাসের ১০ তারিখ ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে শহীদ হন। সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে তাঁদের এই আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম সম্প্রদায় শোক, শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মহরম পালন করেন। শিয়া সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বহু সুন্নি মুসলিমও যথাযোগ্য মর্যাদায় এই দিনটি পালন করে থাকেন।
বীরভূম জেলার সিউড়ি, দুবরাজপুর, খয়রাসোল, রাজনগর, মহম্মদবাজার, রামপুরহাট-সহ বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এ বছরও নানা ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী কর্মসূচির মাধ্যমে মহরম পালিত হয়। জেলার ঐতিহ্যবাহী রাজনগর ইমামবাড়া প্রাঙ্গণে অন্যান্য বছরের মতো এবারও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সম্প্রীতির আবহে মহরমের প্রধান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রাজনগর ব্লকের বিভিন্ন গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ইমামবাড়া প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
আড়ালি, খোদাইবাগ, সাকিরপাড়া-সহ একাধিক গ্রাম থেকে সুদৃশ্য কারুকাজে সজ্জিত তাজিয়া ও নিশান নিয়ে শোভাযাত্রা করে মানুষ ইমামবাড়া প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। পরে প্রাচীন রীতি মেনে তাজিয়াগুলি ইমামবাড়ার সংলগ্ন স্থানে সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা হয়। ঢোলের তালে তালে মর্সিয়া পাঠ, মাতম এবং ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন কসরত ও খেলাধুলার প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটে। মহরম উপলক্ষে বসা একদিনের মেলাও সম্প্রীতির এক অনন্য নজির হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে, দুবরাজপুর শহরেও তাজিয়া ও নিশান শোভাযাত্রার পাশাপাশি প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ জাতীয় পতাকা বহন করা হয়, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিশেষভাবে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মহরমের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় কড়া পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষ করে রাজনগর ইমামবাড়া চত্বরে রাজনগর থানার পুলিশ সতর্ক নজরদারি চালায়। এর আগে জেলা পুলিশের উদ্যোগে প্রতিটি থানায় স্থানীয় মহরম কমিটির সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে শান্তি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ডিজে ব্যবহার, অস্ত্র প্রদর্শন, মদ্যপ অবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য বা বার্তা প্রচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে মহরম কমিটির সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় সহযোগিতায় জেলার সর্বত্র শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে মহরমের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এতে আয়োজক, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *