নয়াপ্রজন্ম প্রতিবেদনঃ
ভারতে ইথানলভিত্তিক জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতীন গড়কড়ী সম্প্রতি ১০০ শতাংশ ইথানল (E100) জ্বালানির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ সামনে এসেছে। অনেকেই দাবি করছেন, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির কারণে গাড়ির মাইলেজ কমছে, আবার কেউ কেউ ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প জ্বালানির সন্ধান অবশ্য নতুন নয়। তবে ইথানলকে ঘিরে এখন যে গতি তৈরি হয়েছে, তা ভারতের জ্বালানি নীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইথানল কী?
ইথানল হলো এক ধরনের অ্যালকোহলভিত্তিক জ্বালানি, যা মূলত আখ, ভুট্টা এবং ধানের মতো কৃষিপণ্য থেকে তৈরি হয়। আখের রস থেকে চিনি উৎপাদনের পর যে মোলাসেস বা ঘন সিরাপ অবশিষ্ট থাকে, তা গাঁজন (fermentation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইথানলে রূপান্তরিত করা হয়। জ্বালানি হিসেবে ইথানলের ব্যবহার নতুন নয়। ১৯০৮ সালে হেনরি ফোর্ডের তৈরি Model T গাড়ি পেট্রোল এবং ইথানল—উভয় জ্বালানিতেই চলতে পারত। তবে সস্তা ও সহজলভ্য পেট্রোলের কারণে সেই সময়ে ইথানল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।
বিশ্বে ইথানলের ব্যবহার
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর ব্রাজিল বৃহৎ পরিসরে ইথানলকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে গ্রহণ করে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রও ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে। আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইথানল উৎপাদক দেশ ব্রাজিল। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের পরিকল্পনা, ফ্লেক্স-ফুয়েল যানবাহনের বিস্তার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ।
ভারতে ইথানলের যাত্রা
ভারতে ২০০০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল বিক্রি শুরু হয়। ২০১৪ সালের পর ইথানল নীতিতে নতুন গতি আসে। ইথানল উৎপাদনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট মূল্যে ইথানল সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু হয়। ২০১৮ সালে জাতীয় ইথানল নীতি প্রণয়ন করা হয়, যেখানে পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ভারত নির্ধারিত সময়ের আগেই E20 জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে। এরপর ২০২৬ সালে E85 জ্বালানি চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রতি লিটার জ্বালানিতে ৮৫ শতাংশ ইথানল এবং ১৫ শতাংশ পেট্রোল থাকে।
ইথানলের সম্ভাব্য সুবিধা
ভারত প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়। সরকারের মতে, ইথানল মিশ্রণের মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। এছাড়া আখ, ভুট্টা এবং ধানের মতো কৃষিপণ্যের নতুন বাজার তৈরি হওয়ায় কৃষকরাও অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পেতে পারেন।
মাইলেজ ও ইঞ্জিন নিয়ে বিতর্ক
ইথানল নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো এর শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা। পেট্রোলের তুলনায় ইথানলের শক্তির ঘনত্ব (Energy density) কম। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহারে গাড়ির মাইলেজ কিছুটা কমে যেতে পারে। অনেক ব্যবহারকারীর দাবি, E20 জ্বালানি ব্যবহারের পর তাদের গাড়ির মাইলেজ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। যদিও সরকারের বক্তব্য, চার চাকার গাড়িতে এই প্রভাব ১ থেকে ২ শতাংশ এবং দুই চাকার গাড়িতে ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।বিশেষজ্ঞদের মতে, ইথানল সহজেই আর্দ্রতা শোষণ করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিন, ফুয়েল লাইন, ইনজেক্টর এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশে ক্ষয় বা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
ব্রাজিলের সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ফ্লেক্স-ফুয়েল যানবাহন এবং পৃথক জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতে ফ্লেক্স-ফুয়েল প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও সীমিত। ইথানলের জন্য পৃথক সংরক্ষণ, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া উপভোক্তাদের স্বার্থে পেট্রোল পাম্পগুলিতে কোন জ্বালানিতে কত শতাংশ ইথানল মিশ্রিত রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে বড় অক্ষরে উল্লেখ করা উচিত। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পেট্রোল বা ইথানলবিহীন জ্বালানির বিকল্পও পর্যাপ্তভাবে উপলব্ধ রাখা প্রয়োজন, যাতে গাড়ির ধরন, প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী গ্রাহকরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
জলের প্রশ্ন
ইথানল উৎপাদন নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বিপুল পরিমাণ জলের প্রয়োজন। ধান, আখ এবং ভুট্টা—তিনটিই অত্যন্ত জলনির্ভর ফসল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক কেজি ধান উৎপাদনে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ লিটার পর্যন্ত জল লাগে। আবার এক লিটার ইথানল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কেজি ধান। অর্থাৎ এক লিটার ইথানল উৎপাদনের জন্য ১০ হাজার লিটারেরও বেশি জল ব্যয় হতে পারে। আখ ও ভুট্টার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় একই। ভারতের বহু অঞ্চলে ইতিমধ্যেই ভূগর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। নীতি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বৃহৎ পরিসরে ইথানল উৎপাদন শুরু হলে জলের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
পরিবেশগত উদ্বেগ
ইথানল কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য, যাকে ভিনাস (Vinasse) বলা হয়, যথাযথভাবে পরিশোধন না করলে তা নদী, পুকুর এবং ভূগর্ভস্থ জলে দূষণ সৃষ্টি করতে পারে। এই বর্জ্যে বিপুল পরিমাণ জৈব পদার্থ থাকে, যা জলে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
রাজনৈতিক বিতর্ক
ইথানল নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। বিরোধীদের অভিযোগ, ইথানল শিল্পের সঙ্গে নীতীন গড়কড়ীর পুত্রদের সংশ্লিষ্ট কিছু সংস্থার ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে।যদিও নীতীন গড়কড়ী বারবার বলেছেন, তাঁর পুত্রদের ব্যবসার সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই এবং নীতি নির্ধারণে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেন না।তবুও বিরোধী দলগুলি এই বিষয়টিকে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত হিসেবে তুলে ধরছে এবং ইথানল নীতি নিয়ে আরও স্বচ্ছতা দাবি করছে।
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প জ্বালানির সন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইথানল সেই পথে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হতে পারে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে নতুন সুযোগ দিতে সক্ষম।তবে মাইলেজ, ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, বিপুল জলের ব্যবহার, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব—এই সমস্ত প্রশ্নের সন্তোষজনক সমাধান ছাড়া ইথানলভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার সাফল্য নিশ্চিত করা কঠিন।ভারত যদি দীর্ঘমেয়াদে ইথানলকে জ্বালানির একটি প্রধান বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশ, জলসম্পদ এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানির গঠন সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, স্পষ্ট লেবেলিং এবং বিশুদ্ধ পেট্রোলের বিকল্প বজায় রাখা উপভোক্তাদের অধিকার রক্ষার জন্য অপরিহার্য।
