
সেখ রিয়াজুদ্দিনঃ
চোখের নিমেষে পরিবারের সদস্যদের সামনে থেকে জলের তোড়ে তলিয়ে অকালে ঝরে পড়ে দুটি তরতাজা যুবকের প্রান। স্থানীয় এলাকাবাসীর ক্ষোভ বেপরোয়া বালি লুটের জেরে এরূপ ঘটনা ঘটেছে। সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অজয় নদীর গর্ভ খুবলে খাওয়ার কারনে এক মর্মান্তিকতার সাক্ষী হয়েছে প্রত্যন্ত এক জনপদ। অবৈজ্ঞানিক ভাবে যথেচ্ছ বালি তোলার ফলেই নদীবুকে এখান সেখানে তৈরি হওয়া গভীর গর্তে পরিনত হয়েছে। যারফলে জলের গভীরতা আন্দাজ করতে না পেরে অজয় নদীতে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে উনিশ ও চোদ্দ বছরের দুই ভাইয়ের। তাঁরা সম্পর্কে পিসতুতো-মামাতো ভাই। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার বীরভূমের খয়রাশোল থানা এলাকায় অজয় নদীর পাড়ে থাকা গ্রাম চূড়োর কলোনীতে। গ্রামবাসীদের মুখে শোনা যায় স্থানীয় বাসিন্দা বিরেন মন্ডল মারা যাওয়ায় তাঁর ক্ষৌরকর্ম সম্পন্ন করার জন্য অজয় নদের পাড়ে গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। ক্ষৌরকর্ম শেষে স্নানের জন্য প্রয়াত বিমান মন্ডলের ছেলে, ভাইপো, নাতিরা নদীতে নামেন। বিরেন মন্ডলের ছেলে বিমান মন্ডল জানিয়েছেন, “আমরা তিন ভাই, আমার দুই ভাইপো এবং এক ভাগ্মে একসাথে স্নান করতে নেমেছিলাম। আচমকা আমার বড় ভাইপো প্রথমে তলিয়ে যায়। সাথে সাথে আমার দাদারা তাঁকে টেনে তুলতে না তুলতেই আমার অপর ভাইপো ও ভাগ্নেরও এক অবস্থা হয়। আমি পরণের গামছা খুলে ওদের তোলার চেষ্টা করলেও সম্ভব হয় নি। ওঁরা দুজনেই নদীর তলায় চলে যায়।” প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনার খবর পেয়ে আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন ছুটে আসে। গ্রামের মানুষই প্রথম মাছধরা জাল সহকারে উদ্ধারকার্যে নামে । পরে আসে স্থানীয় থানার পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা। মাছ ধরার জালের মাধ্যমে উদ্ধারকারীরা প্রথমে বিমান মন্ডলের ভাইপো তিমির মন্ডল(১৯)কে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। তারও একঘন্টা পর উদ্ধার করা হয় বিমান মন্ডলের ভাগ্নে কৌশিক হালদারকে (১৪)। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক চিকিৎসা করার পর দুজনকেই মৃত বলে ঘোষনা করেন। বিমান মন্ডল জানিয়েছেন, “ভাইপো ভাগ্নেরা আমার কাছে একসাথেই থাকতো। ভাগ্নে তাঁর বাবাকে হারিয়েছিল আড়াই বছর বয়সে। ওঁর মা বাইরে কাজ করে। যারফলে সে আমার কাছে মানুষ হয়েছিল।
দুই তরতাজা প্রানকে হারিয়ে কান্নার রোলে ভেসেছে গোটা এলাকা। শোকে বাকরুদ্ধ হয়েছে জনপদ। ক্ষোভের আঁচও সমান মাত্রায় ছড়িয়েছে এলাকায়। এলাকাবাসীর ক্ষোভ, দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ বালির কারবারের জন্য ছিন্নভীন্ন হয়েছে নদীবুক। কাঁচা টাকা লুটের কাছে ফিকে হয়েছে নদী, তার জীব বৈচিত্র্য, মানুষের প্রাণ। বালি উত্তোলনের জন্য মেশিন নামিয়ে নদীবুক খুঁড়তে খুঁড়তে কত গভীরে পৌছেছে জানেন না কেউ। ফলে নদীর তলাদেশ কোথায় কতটা গভীর তার আন্দাজ করাই মুসকিল। দুই মৃত্যুর পরে পরেই এলাকার ক্ষুব্ধ মানুষ পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, বালি লুটের জন্য গত দু-বছরে চলে গিয়েছে ৯ টি প্রাণ। অবিলম্বে বন্ধ করা হোক বালি ঘাট। মৃতদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরনের ব্যবস্থা করতে হবে । শোকস্তব্ধ পরিবারে এদিন সমবেদনা জানাতে গিয়ে এলাকার বাসিন্দা তথা প্রাক্তন বিধায়ক বিজয় বাগদী বলেছেন, “স্রেফ লুটের আধিপত্য কায়েমের জন্য একের পর এক প্রাণহানি হচ্ছে। নদীর তলাদেশ বিপন্ন। গত এক দশক ধরে পুলিশ-প্রশাসনের মদতে প্রাক্তন শাসক দল আশ্রিত কারবারীরা এই লুটের কারবার চালিয়েছে মুনাফার জন্য। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
